রাজনৈতিক প্রভাবে কমছে না দুর্নীতি

36

সোনারদেশ২৪: ডেস্কঃ

সরকারি ক্রয়ে ই-জিপি’র (ই-গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট) চালুর ফলে প্রক্রিয়া সহজ হয়েছে। কিন্তু কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব, যোগসাজশ এবং অসাধু সিন্ডিকেট এখনও প্রধান সমস্যা।

বুধবার দুর্নীতি বিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআইবি) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলা হয়।

সংস্থাটি বলেছে, সব ধরনের ক্রয়ে ই-জিপি’র ব্যবহার নেই। এছাড়া ই-জিপি প্রবর্তনের ফলে সরকারি ক্রয় ম্যানুয়াল থেকে কারিগরি পর্যায়ে উত্তরণ ঘটলেও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের একাংশ দুর্নীতির নতুন পথ খুঁজে নিয়েছে। বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা থেকে উত্তরণে ১৩ দফা সুপারিশ করা হয় সংবাদ সম্মেলনে।

এ সময় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এ সংক্রান্ত একটি গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাহজাদা এম আকরাম।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়- গবেষণায় সরকারি ক্রয়ে সুশাসনের আঙ্গিকে ই-জিপি’র প্রয়োগ ও কার্যকরতা পর্যালোচনায় ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রথম দিকের চারটি প্রতিষ্ঠান- স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি), সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ), বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)-কে বাছাই করা হয়।

গবেষণায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘ট্রাফিক সিগন্যাল পদ্ধতি’ ব্যবহার করা হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, ই-জিপি প্রক্রিয়া, ই-জিপি ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এবং কার্যকরতা- এই পাঁচটি ক্ষেত্রের অধীনে ২০টি নির্দেশকের ভিত্তিতে সরকারি ক্রয় আইন কতটুকু কার্যকর তা পর্যালোচনা করা হয়েছে।

প্রত্যেক নির্দেশককে উচ্চ, মধ্যম ও নিু স্কোর দিয়ে তাদের অবস্থান বোঝানো হয়েছে। স্কোরের গ্রেডগুলো হল- ‘ভালো’ (৮১ শতাংশ বা তার বেশি), ‘সন্তোষজনক’ (৬১ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ), ‘ভালো নয়’ (৪১ শতাংশ-৬০ শতাংশ), ‘উদ্বেগজনক’ (৪০ শতাংশ বা তার নিচে)।

গবেষণায় দেখা যায়- অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৫০ শতাংশ স্কোর পেয়েছে সওজ। ৪৪ শতাংশ স্কোর পেয়েছে আরইবি, পাউবো পেয়েছে ৪৩ শতাংশ এবং এলজিইডি পেয়েছে ৪২ শতাংশ। অর্থাৎ সব প্রতিষ্ঠানের অবস্থানই ‘ভালো নয়’ গ্রেডে।

সব প্রতিষ্ঠানই প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশ স্কোর পেয়ে মোটামুটি ভালো ও প্রায় কাছাকাছি অবস্থানে আছে; তবে সওজ ও আরইবির সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে ভালো।

ই-জিপি প্রক্রিয়া মেনে চলার ক্ষেত্রে প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই ৫৮ শতাংশ থেকে ৬৪ শতাংশ স্কোর পেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ই-জিপি ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকরতায় কোনো প্রতিষ্ঠানই কোনো স্কোর পায়নি।

আবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে সব প্রতিষ্ঠানের স্কোর ১৯ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ অর্থাৎ হতাশাব্যঞ্জক। প্রাপ্ত গ্রেড অনুযায়ী সব প্রতিষ্ঠানের অবস্থান সার্বিকভাবে ঘাটতিপূর্ণ।

ই-জিপি ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এবং কার্যকরতায় অবস্থান উদ্বেগজনক। যেসব নির্দেশকে অবস্থান উদ্বেগজনক সেগুলো হচ্ছে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা, প্রাক-দরপত্র সভা, ই-চুক্তি ব্যবস্থাপনা, কার্যাদেশ বাস্তবায়ন তদারকি, নিরীক্ষা, কর্মচারীদের সম্পদের তথ্য প্রকাশ, অনিয়ম ও দুর্নীতি এবং কাজের মান।

প্রতিবেদন অনুযায়ী ই-জিপির প্রবর্তনের ফলে সার্বিকভাবে সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে- শিডিউল ছাপাতে ও নথি সংগ্রহ করতে হয় না বিধায় শিডিউল কেনা ও জমা দেয়া এবং যাচাইয়ের কাজ দ্রুত হচ্ছে।

এছাড়াও দরপত্র জমা নিয়ে সব ধরনের দাঙ্গা-হাঙ্গামা, মারামারি, বোমা হামলা, বাক্স ছিনতাই ও চুরি, জমায় বাধা দেয়া এবং টেন্ডারবাজি ইত্যাদি দূর হয়েছে। তবে দুর্নীতি কমার সঙ্গে ই-জিপির তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। এখনও নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি বিদ্যমান।

রাজনৈতিকভাবে কাজের নিয়ন্ত্রণ ও ঠিকাদারদের মধ্যে ভাগ করে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। কিছু কিছু এলাকায় কোনো বিশেষ কাজে কারা টেন্ডার সাবমিট করবে, সেটা রাজনৈতিক নেতা বিশেষ করে স্থানীয় সংসদ সদস্য ঠিক করে দেন।

অনেক ক্ষেত্রে একটি বড় লাইসেন্সের অধীনে কাজ নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা তার কর্মীদের মধ্যে বণ্টন করে দেন।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অনেক প্রত্যাশা নিয়ে ই-জিপি’র প্রবর্তন হয়েছে। আমরা ভেবেছিলাম এর ফলে সরকারি ক্রয় খাতে সুশাসন ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আশানুরূপ ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যাবে। কিন্তু হতাশার বিষয় হল ই-জিপি’র ফলে ক্ষেত্র বিশেষে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলেও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও কাজের মানন্নোয়নে এর কোনো প্রভাবই পড়েনি। ই-জিপি ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এবং কার্যকরতার মতো তিনটি মৌলিক ক্ষেত্রেই অবস্থান উদ্বেগজনক। সার্বিকভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়েছে। এর পেছনে মূলত রাজনৈতিক প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আমাদের দেশে রাজনীতিকে সম্পদ বিকাশের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার দৃষ্টান্ত রয়েছে। যা থেকে সরকারি ক্রয় খাতও মুক্ত নয়। ই-জিপি’কে রাজনৈতিক প্রভাব, যোগসাজশ ও সিন্ডিকেটের দুষ্টচক্র থেকে মুক্ত করতে সব পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি ও জনগুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যবসায়িক সম্পর্কের সুযোগ বন্ধ করতে হবে। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীর নিয়ম মেনে অবশ্যই সম্পদ বিবরণ প্রকাশ করতে হবে। ব্যবস্থাপনায় কিছু দুর্বলতা রয়েছে, সদিচ্ছা থাকলে তা থেকে উত্তরণ সম্ভব বলে আমরা মনে করি।

অবস্থার উত্তরণে ১৩ দফা সুপারিশ করেছে টিআইবি। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- ই-জিপি’কে রাজনৈতিক প্রভাব, যোগসাজশ ও সিন্ডিকেটের দুষ্টচক্র থেকে মুক্ত করা। এ লক্ষ্যে সব পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি ও জনগুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যবসায়িক সম্পর্কের সুযোগ বন্ধ করতে হবে।

You might also like