সোমবার, ৯ই ফেব্রুয়ারি,
২০২৬

  • সারাদেশ

  • পাবনা-৩: বিদ্রোহীর ঘোড়ায় ধানের শীষ ‘খেলে’ দাঁড়িপাল্লার হবে পোয়া বারো


    সোনারদেশ ২৪ ডেস্ক


    সোমবার, ৯ই ফেব্রুয়ারি,

    ২০২৬

    /

    1 বার পড়া হয়েছে


    a পাবনা-৩ আসনে প্রধান তিন প্রতিদ্বিন্দ্বী স্বতন্ত্র আনোয়ারুল ইসলাম, বিএনপির হাসান জাফির তুহিন ও জামায়াতের আলী আছগার।

    সোনারদেশ২৪: ডেস্কঃ


    ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চলনবিলবিধৌত কৃষি ও মৎস্য ভান্ডারখ্যাত এবং দুধ, ডিম, ঘিপ্রসিদ্ধ পাবনা-৩ আসনে ভোটের জটিল সমীকরণ বলছে, বিএনপির ধানের শীষ তাদেরই বিদ্রোহীর ঘোড়ায় খেলে তুল্যমূল্য করে দাঁড়িপাল্লায় ফসল মেপে ঘরে তুলতে পারে জামায়াত। 


    ৮ ও ৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনি প্রচারের মাঠে ঘুরে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর নেতাকর্মীদের বক্তব্য থেকে এমন আভাস পাওয়া গেছে। সারা দেশের মতো এই আসনেও ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ হবে। 


    আর চায়ের দোকান থেকে ফসলের মাঠ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে অফিস পাড়া, হাট-বাজার সব জায়গাতেই এখন একটিই জিজ্ঞাসা, কে হতে যাচ্ছেন তাদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি।


    চাটমোহর-ভাঙ্গুড়া-ফরিদপুর এই তিন উপজেলা নিয়ে গঠিত পাবনা-৩ আসন। 


    স্থানীয় বিএনপিতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সংকট রয়েছে। তবে শেষ মুহূর্তে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ধানের শীষের প্রার্থীকেই জয়ী করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। নির্বাচনি প্রচারে এক পক্ষ আরেক পক্ষের বিরুদ্ধে বিষোধগার করে ভোট টানার চেষ্টা করছেন। বিএনপির ধানের শীষের প্রতিপক্ষ বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত নেতার ঘোড়া।


    অবশ্য নির্ভার রয়েছে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা। ফলে ‘কেহ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান’ অবস্থা বিরাজ করছে পাবনা-৩ আসনে।


    পাবনা-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন কৃষক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন। তিনি সুজানগর উপজেলার বাসিন্দা। পাবনা-২ আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। তবে দল তাকে উন্নয়নের স্বার্থে পাবনা-৩ আসনে মনোনয়ন দিয়ে পাঠায়। 


    দলীয় মনোনয়ন নিয়ে তুহিন নির্বাচনি এলাকায় এলেই তৃণমূল পর্যায়ে নানা অসন্তোষ দেখা দেয়। বিএনপির একটি পক্ষ সাবেক এমপি ও চাটমোহর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি কেএম আনোয়ারুল ইসলাম এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান, সাবেক সদস্য সচিব হাসাদুল ইসলাম হীরার নেতৃত্বে তুহিনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিরোধিতায় নামেন। প্রার্থীকে স্থানীয় হতে হবে বলে দাবি তুলে মশাল মিছিলসহ একাধিক কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায় বিএনপির বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের।


    যখন তুহিনের দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত হয়, তখন দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে সাবেক সংসদ সদস্য কেএম আনোয়ারুল ইসলাম স্বতন্ত্র প্রার্থী হন; প্রতীক হিসেবে পান ঘোড়া। তার সঙ্গে নির্বাচনি প্রচারে যোগ দেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব হাসাদুল ইসলাম হীরা, পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম তাইজুল তিন উপজেলার প্রথম সারির একগুচ্ছ নেতা।


    অন্যদিকে উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব ফারুক হোসেন, পৌর যুবদলের আহ্বায়ক তানভির জুয়েল লিখন, স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব আসাদুজ্জামান লেবু দলীয় প্রার্থী তুহিনের পক্ষে ধানের শীষের ভোটের জন্য মাঠে নামেন। তবে অভ্যন্তরীণ কারণে আবার তারা গত ২ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করে স্থানীয় প্রার্থী কেএম আনোয়ারুল ইসলামের পক্ষে নির্বাচন করার ঘোষণা দেন। 


    আনোয়ারুল ইসলাম, হাসাদুল ইসলাম হীরা, তাইজুল, লিখন, ফারুক, লেবু, আরিফকে বহিষ্কার করে বিএনপি। 


    তাদের ছাড়া উপজেলা ও পৌর বিএনপির বেশিরভাগ নেতাকর্মী দলীয় প্রার্থী হাসান জাফির তুহিনের পক্ষে কাজ করছেন।


    তিন উপজেলা নিয়ে গঠিত পাবনা-৩ আসনে প্রায় দুই যুগ হলো চাটমোহর উপজেলার কোনো নেতা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হননি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে আছেন চাটমোহরের মানুষ। নিজেদের উপজেলার সংসদ সদস্য বানাতে তাই অনেকে একাট্টা। তারা চাইছেন ‘চাটমোহর ইজম’ কাজে লাগিয়ে স্থানীয় স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলামের ঘোড়াকে জেতাতে। 


    আরেকটি সমীকরণ রয়েছে। তিন উপজেলার মধ্যে চাটমোহরে ভোটার সংখ্যা বেশি। এই উপজেলায় ভোটার ২ লাখ ৫৮ হাজার ৫০০ জন। ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর দুই উপজেলা মিলিয়ে ভোটার ২ লাখ ২৪ হাজার ৩০২ জন। সেই হিসেবে দুই উপজেলার ভোটারের চেয়ে চাটমোহর উপজেলায় ৩৪ হাজার ১৯৮টি ভোট বেশি। তাই চাটমোহরের এই ৩৪ হাজার ভোট যিনি বেশি পাবেন, তিনি-ই ভোটের বৈতরণী পার হয়ে যাবেন বলে অনেকের ধারণা।


    সেক্ষেত্রে চাটমোহরের স্থানীয় প্রার্থী হিসেবে আনোয়ারুল ইসলাম এগিয়ে আছেন। তার নিজস্ব ভোটব্যাংকও রয়েছে। হিন্দুদের একটি বড় অংশের ভোটও তিনি পাবেন। পাশাপাশি আওয়ামী সমর্থকদের ভোটের উল্লেখযোগ্য অংশ তিনি-ই পাবেন বলে আভাস মিলছে। 


    বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী তুহিন চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুরে দলের প্রার্থী হিসেবে বাড়তি সুযোগ কাজে লাগাতে পারছেন। দলীয় নারী-পুরুষ নেতাকর্মীরা বিরতিহীনভাবে চলনবিলের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে নানা উন্নয়ন আর ওয়াদা দিয়ে দ্বারে দ্বারে ভোট প্রার্থনা করছেন। 


    প্রচারের প্রথম দিকে দলে বিভক্তি প্রকট থাকলেও শেষ মুহূর্তে বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা সংগঠিত হয়েছেন। তারা তাদের দলের প্রার্থী তুহিনকে বিজয়ী করতে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রচার অব্যাহত রেখেছেন। 


    নির্বাচিত হলে চলনবিল নিয়ে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তুহিন।


    জামায়াতের প্রার্থী ভাঙ্গুড়া উপজেলার বাসিন্দা মাওলানা আলী আছগার অভ্যন্তরীণ দলীয় সংকট না থাকায় নিরবিচ্ছিন্নভাবে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। তার কর্মীবাহিনী, নারী সদস্যরা নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে দিন-রাত ভোট চাচ্ছেন। 


    বলতে গেলে, নির্ভার রয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী আছগর। বিগত নির্বাচনগুলোতে পাবনা-৩ আসনে জামায়াতের ভোট নগণ্য ছিল। তবে এই নির্বাচনে জামায়াতের ভোট অনেক বেড়েছে বলে দাবি করেছেন দলটির স্থানীয় অনেক নেতা। 


    তিন উপজেলায় বলাবলি হচ্ছে, বিএনপির প্রার্থী বনাম বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর ভোট কাটাকাটির সুযোগ নিয়ে ভোটের মাঠে বাজিমাত করতে পারেন জামায়াতের প্রার্থী। ফলে এই আসনের লড়াইটা হবে ত্রিমুখী।


    অনেকে বলছেন, পাবনা-৩ আসনে জয়ের ব্যাপারে মূল ফ্যাক্টর হবে ফরিদপুরের ভোট। চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়ায় শক্তিশালী প্রার্থী থাকলেও ফরিদপুরের কোনো প্রার্থী নেই। এই কারণে ফরিদপুরে যে প্রার্থী বেশি ভোট পাবেন, তারই জয়লাভ করার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।


    পাবনা-৩ আসনের অন্য প্রার্থীরা হলেন, গণঅধিকার পরিষদের হাসানুল ইসলাম (ট্রাক), ইসলামী আন্দোলনের আব্দুল খালেক (হাতপাখা), গণফোরামের সরদার আশা পারভেজ (উদিয়মান সূর্য্য), জাতীয় পার্টির মীর নাদিম ডাবলু (লাঙ্গল), সুপ্রিম পার্টির মাহবুবুর রহমান জয় (একতারা)।


    চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর উপজেলায় মোট ৪ লাখ ৮২ হাজার ৮০২ ভোটার রয়েছেন। এর মধ্যে চাটমোহর উপজেলায় ভোটার ২ লাখ ৫৮ হাজার ৫০০, ভাঙ্গুড়া উপজেলায় ১ লাখ ৭ হাজার ৭১১ এবং ফরিদপুর উপজেলায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৫৯১।


    চাটমোহর থেকে সর্বশেষ ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কেএম আনোয়ারুল ইসলাম বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর ভাঙ্গুড়া উপজেলার বাসিন্দা আওয়ামী লীগের প্রার্থী মকবুল হোসেন নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন। তারপর বিতর্কিত তিনটি নির্বাচনে মকবুলই আসনটি ধরে রেখে সংসদে ছিলেন।


    চাটমোহর পৌর সদরের বেসরকারি চাকুরীজীবী সাইফুল ইসলাম বলেন, চাটমোহরের ভোট বড় ফ্যাক্টর। এখানে কোনো প্রার্থী যদি ৪০ হাজার ভোটে এগিয়ে থাকে, তাহলে তিনি বিজয়ের মালা পরবেন বলে মনে হয়।


    ভ্যানচালক মনজু হোসেন বলেন, “আমরা চাই সুষ্ঠু ভোট হোক, আমরা যাতে ভালোভাবে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের ভোট নিজে দিয়ে বাড়ি ফিরতে পারি। কোনো গ্যানজাম-ফ্যাসাদ চাই না। আর কে জিতবে, সেটা নিয়ে মাথাব্যথা নাই। যিনি জিতবেন, তিনি যেন এলাকার মানুষের জন্য কাজ করেন।”


    বাহাদুরপুর গ্রামের কৃষক শাজাহান আলী বলেন, “ধানের শীষ আর ঘোড়া প্রতীকের লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। যেই জিতুক অল্প ভোটের ব্যবধানে জিতবেন। তবে কে জিতবেন বলা মুশকিল। চাটমোহরে মোট কাস্টিং ভোটের মধ্যে যে প্রার্থী নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর চেয়ে ডাবল ভোটে এগিয়ে থাকবেন, তিনি জয় পেতে পারেন। কারণ ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর উপজেলার ভোট কেমন হবে, বলা মুশকিল।”


    বিএনপি প্রার্থী কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন বলেন, “এমপি পদপ্রার্থী হিসেবে এই প্রথমবার নির্বাচন করছি আমি। ৪২ বছর ধরে রাজনীতি করছি। আর রাজনীতির মুল উদ্দেশ্য হলো জনগণের সেবা করা। সেই সেবা করার উত্তম মাধ্যম হচ্ছে নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদে যাওয়া। সেখানে গিয়ে আইন প্রনয়ণ করা একইসঙ্গে জনগণের সেবা করা। কৃষিপ্রধান এলাকা হিসেবে পাবনা-৩ এলাকায় আমি কৃষিবিদ হওয়ায় আমার পক্ষে ব্যাপক জোয়ার আছে। আশা করছি, মানুষ ধানের শীষকেই বিজয়ী করবে।”


    স্বতন্ত্র প্রার্থী কে এম আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, “দল মনোনয়ন দেয়নি। কিন্তু স্থানীয় প্রার্থী হিসেবে জনগণের ভালবাসায় তাদের চাওয়ায় প্রার্থী হয়েছি। এর আগেও আমি দুইবার এমপি ছিলাম। তাই পাবনা-৩ এলাকার সবকিছু আমার নখদর্পণে। আমার ঘোড়া প্রতীকের পক্ষে মানুষ একাট্টা। আশা করছি, বিপুল ভোটে জয়ী হব। প্রশাসনের কাছে দাবি, ভোটে যেন কেউ কারচুপি করতে না পারে।”


    জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক আলী আছগার বলেন, “৫ আগস্টের পর থেকে সারা দেশের মতো পাবনা-৩ আসনেও জামায়াতের গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এ অঞ্চলের ভোটাররা এর আগে বিএনপি, আওয়ামী লীগ সবাইকে নির্বাচিত করে দেখেছে, তারা কী পেয়েছে। তাই এবার বিকল্প চিন্তা করছে মানুষ। বিশ্বাস করি, ত্রিমুখী লড়াইয়ে আমি জিতবো ইনশাআল্লাহ।”


    সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চাটমোহর উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক কে এম বেলাল হোসেন স্বপন বলেন, “প্রথম কথা হলো কত পার্সেন্ট ভোট কাস্ট হবে। আমাদের ধারণা, তিন উপজেলা মিলিয়ে ৫০ পার্সেন্ট ভোট কাস্ট হবে। সেক্ষেত্রে চাটমোহরে স্থানীয় প্রার্থী হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থীর ঘোড়া এগিয়ে আছে। অন্য দুই উপজেলায় বিএনপির ধানের শীষ এগিয়ে আছে।”


    যদি ভোট ৫০ পার্সেন্টের ওপরে বেশি কাস্ট হয় সেক্ষেত্রে ঘোড়া জিতে যাওয়ার সম্ভাবনাও বেশি। এখন দেখার বিষয় ভোটার উপস্থিতি কেমন হয়। 






    সংবাদটি শেয়ার করুন


    সম্পাদক ও প্রকাশকঃ জিয়াউল হক
    নির্বাহী সম্পাদকঃ মোস্তাক আহম্মেদ নওশাদ


    যোগাযোগ- মুজিব সড়ক, কমিউনিটি হাসপাতাল ৫ তলা, সিরাজগঞ্জ
    ইমেইল- sonardesh24.corr@gmail.com
    মোবাইল : 01324 977 175, 01716-076444




    Copyright © 2026 - All right reserved by Sonar Desh 24 Ltd