অপরিকল্পিত নগরায়নে দুর্দশায় গাজীপুর

23

সোনারদেশ২৪: ডেস্কঃ

নগরজুড়েই পরিকল্পনাবিহীন ছোট-বড় অগণিত স্থাপনা। বর্ষণ কিংবা মানবসৃষ্ট পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে গাজীপুর মহানগরে চরম জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। অথচ নিকট অতীতে শিল্প উদ্যোক্তাদের কাছে ঢাকার পার্শ্ববর্তী গাজীপুর মহানগর ছিল তীর্থস্থান। ২০১৩ সালে গাজীপুর সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠিত হলেও নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার জন্য গত সাত বছরেও প্রস্তুত হয়নি মাস্টার প্ল্যান।

জানা গেছে, গত মঙ্গলবার গাজীপুরের উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং আবাসনের জন্য পরিকল্পনা নিতে ‘গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল-২০২০’ সংসদে পাস হয়। আইন অনুসারে ‘পরিকল্পনার বাইরে কেউ জমি ব্যবহার করলে তাকে গুণতে হবে মোটা অংকের জরিমানা।’ বিশ জনের সমন্বয়ে গঠিত হবে এই কর্তৃপক্ষ। এর আগে ২০১৩ সালের ১৬ জানুয়ারি ৫৭টি ওয়ার্ড নিয়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠিত হয়।

২০১০ সালের ১৬ মার্চ বিশেষ শ্রেণির জেলা হিসেবে গাজীপুর জেলার নাম ঘোষিত হয়। ২০১৮ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে গাজীপুর মহানগরকে আটটি থানায় বিভক্ত করে মেট্রোপলিটন পুলিশিং কার্যক্রম শুরু হয়। গাজীপুর মহানগরের টঙ্গী এবং কোনাবাড়ীতে দুটি শিল্প নগরী রয়েছে। অনুসন্ধান বলছে, গত দেড় দশকে গাজীপুর মহানগরের প্রতিটি ওয়ার্ডেই ছোট-বড় বিভিন্ন ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন দেশের বিভিন্ন জেলার লাখ লাখ মানুষ। এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের আবাসন ও নিত্যপণ্যের চাহিদা পূরণ করতে নগরীতে অগণিত শপিংমল, সবজি বাজারসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।

গাজীপুর মহানগরে ছোট-বড় মিলে অন্তত বিশটি বস্তি এলাকা রয়েছে। এসব এলাকায় নিম্ন শ্রেণির হতদরিদ্র পরিবারগুলোর বসবাস। গাজীপুর সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর গত আট বছরে নগরীতে অগণিত অপরিকল্পিত ছোট-বড় স্থাপনা গড়ে উঠেছে। নগরে খানাখন্দে ভরা সরু সড়ক, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থায় বছর জুড়েই জলাবদ্ধতা, যত্রতত্র ময়লা আবর্জনার ভাগাড়, সড়ক-মহাসড়কে দিনরাত অসহনীয় যানজট, বিভিন্ন শিল্প-কলকারখানার দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে নিম্নমানের সরঞ্জাম এবং সঞ্চালন লাইন দিয়ে চলমান অবৈধ গ্যাস সংযোগ এবং মারাত্মক বায়ু ও পরিবেশ দূষণে গাজীপুর মহানগরের প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপর্যস্ত।

এ ছাড়া গাজীপুর মহানগরের বেশ কিছু এলাকায় আশঙ্কাজনকভাবে ভূ-গর্ভস্থ বিশুদ্ধ পানির স্তর অন্তত দুইশ ফুট নিচে নেমে গেছে। এভাবে পানির স্তর নিচে নামতে থাকলে অদূর অভিষ্যতে ওইসব এলাকায় ভূমিধস এবং ভূমিকম্পে মারাত্মক মানবিক বিপর্যয় ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। নগরীর খাল, বিল এবং জলাশয়গুলোর পানি বিভিন্ন শিল্প-কলকারানার দূষিত তরল বর্জ্যেেত বিষাক্ত হয়ে পড়েছে।

অনুসন্ধান আরও বলছে, নগরের সরু সড়কগুলো প্রশস্তকরণসহ সুষ্ঠু ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিশ্চিতে কাজ করছে নগর ভবন। তবে ক্ষতিপূরণ ছাড়াই নগর ভবনের এসব সড়ক নির্মাণে ফলে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে নগরীর অগণিত পরিবারকে। কোথাও কোথাও এসব সড়ক নির্মাণে দেখা দিয়েছে আইনি জটিলতা। পরিকল্পনাবিহীন গড়ে ওঠা অগণিত ছোট-বড় স্থাপনা সমৃদ্ধ গাজীপুর সিটি করপোরেশনে গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং নগর ভবনের মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন বেশ চ্যালেঞ্জিং বলে অভিমত নগরবাসীর। নগরের এসব বহুমুখী জনদুর্ভোগের কারণে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্প কলকারখানা স্থাপনে ইচ্ছুকরা ক্রমেই গাজীপুর সিটি করপোরেশন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সিনিয়র নগর পরিকল্পাবিদ মো. মইনুল ইসলাম বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের জন্য মাস্টার প্ল্যান প্রস্তুত হচ্ছে। তবে এই মাস্টার প্ল্যান প্রস্তুত করতে ২০২১ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের গাজীপুর উপ-পরিচালক মো. মাহবুব আলম বলেন, গাজীপুর মহানগরে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর যেমন নিচে নেমেছে তেমনি কৃষি জমি কমেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন চাষিদের বিপর্যস্ত করেছে। বিভিন্ন শিল্প-কলকারখানা থেকে নির্গত তরল বর্জ্যতে নগরীর বিভিন্ন এলাকার কৃষি জমিসহ আবাসিক এলাকা দূষিত হচ্ছে।

গাজীপুর চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আনোয়ার সাদত সরকার জানান, নগরীতে একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চাইলে সরকারি বিভিন্ন দফতর থেকে অনুমতি নিতে হয়। এতে যেমন ব্যয় তেমনি দীর্ঘসূত্রতার শিকার হতে হয়। এসব জটিলতার কারণে গাজীপুর মহানগরের পরিবর্তে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় শিল্প-প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে আগ্রহী শিল্প উদ্যোক্তারা।

তবে গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম শুরু হলে সিটি করপোরেশন পরিকল্পিত নগরে রূপ নেবে। যদিও ইতিমধ্যে নগরীতে অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠেছে। তবে সময় যেমন শেষ হয়নি তেমনি দ্রুত গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম শুরু করা প্রয়োজন। গাজীপুরে বিগত দিনে ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) কার্যক্রম বিভিন্ন কারণে প্রতিবন্ধতার শিকার হয়েছে। যদিও কিছু ত্রুটি ছিল। তবে ‘ড্যাপ’ বাস্তবায়িত হলে অপরিকল্পিত নগরায়নের সুযোগ সৃষ্টি হতো না বলেও তিনি মনে করনে।

You might also like