আ.লীগ-হেফাজতে দূরত্ব!

17

সোনারদেশ২৪: ডেস্কঃ

নতুন করে আলোচনায় এসেছে দেশের ইসলামপন্থী ‘অরাজনৈতিক’ সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। ২০১৩ সালের পর আওয়ামী লীগ হেফাজতকে নিজেদের তীরে ভেড়াতে সক্ষম হয়। তবে হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা শফীর মৃত্যুর পর পাল্টে যায় অনেক কিছু। আওয়ামী লীগ ও হেফাজতের মধ্যে দূরত্বও প্রকাশ্যে আসে।

নানা ইস্যুতে হেফাজত নেতাদের বক্তব্যে সরকারের বিরোধিতার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সরকারদলীয় নেতারাও নানা কারণে পাল্টা জবাব দিচ্ছেন। ফলে আওয়ামী লীগ ও হেফাজতের সম্পর্কের নেতিবাচক দিকটি ফুটে ওঠে। এর কারণ হিসেবে উভয়পক্ষই বলছে, হেফাজতের মূল নেতৃত্বে বিএনপি-জামায়াতপন্থীরা ভর করছেন। এতে বেকায়দায় পড়ছেন আল্লামা শফীর অনুসারীরা।

সম্প্রতি ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতাসহ নানা ইস্যুতে কঠোর বক্তব্য দিয়েছেন মাওলানা মামুনুল হকসহ হেফাজতের শীর্ষ কয়েকজন নেতা। তবে সরকারদলীয় নেতারাও তাদের কঠোর অবস্থান জানান দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল-আলম হানিফ বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুর নির্মাণাধীন ভাস্কর্য নিয়ে যারা উল্টাপাল্টা কথা বলছেন, তাদের মনে রাখা দরকার এটা পাকিস্তান নয়। এটা স্বাধীন বাংলাদেশ। স্বাধীন বাংলাদেশে এ ধরনের বক্তব্য বরদাশত করা হবে না। এই কুচক্রীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’ দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতাকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘যতটুকু বলেছেন ক্ষমা চেয়ে সাবধান হয়ে যান, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করলে ঘাড় মটকে দেব।’ গতকাল মঙ্গলবার এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন বলে জানিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, ২০১০ সালে কওমি আলেমদের নিয়ে চট্টগ্রামে গঠিত হয় ‘হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ’ নামের অরাজনৈতিক সংগঠন। রাসুল (সা.) এর অবমাননা, নারী উন্নয়ন নীতিমালা ও ধর্ম নিরপেক্ষ শিক্ষানীতিসহ নানা বিষয়ে তাদের কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ থাকলেও ২০১৩ সালে রাজনৈতিক ফ্যাক্টর হিসেবে সামনে আসে সংগঠনটি। ওই বছরের ৫ মে ১৩ দফা দাবিতে শাপলা চত্বরে অবস্থান করে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে হেফাজত। সে সময়ে তাদের কাঁধে ভর করে সরকার পতনেরও চেষ্টা করে বিএনপি-জামায়াত। তবে সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। পরে দীর্ঘ প্রচেষ্টায় বিরোধী মহলের কব্জা থেকে বের করে হেফাজতের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে সরকারি দল।

বিশেষ করে কওমি সনদসহ আলেমদের বিভিন্ন দাবিতে ইতিবাচক সাড়া দেয় সরকার। এতে সরকারি দল ও হেফাজতের কাছাকাছি আসার সুযোগ হয়। সে সময় সরকারের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক শেখ আবদুল্লাহ, প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব জয়নুল আবেদীন, আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদসহ অনেকে কাজ করেন।

হেফাজতের আমির আল্লামা আহমদ শফী, তার ছেলে আনাস মাদানী, শামছুল হক ফরিদপুরীর (রহ.) ছেলে মাওলানা রুহুল আমিনসহ হেফাজতের অনেক নেতাও এগিয়ে আসেন। সরকারের পক্ষ থেকে গুরুত্ব দিয়ে আলেমদের দীর্ঘদিনের চাওয়া কওমি সনদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এ নিয়ে হেফাজত শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সরকার প্রধানেরও সভা হয়েছে। হেফাজতও স্বীকৃতি পেয়ে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ শুকরানা মাহফিল করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধিতে ভূষিত করেন। হেফাজতের সঙ্গেকার এ সম্পর্ক গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ নানা সময় বেশ কাজেও লাগিয়েছে আওয়ামী লীগ। তবে এখন এই সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে।

দুই পক্ষ থেকে বলা হয়, দূরত্ব বা টানাপড়েনের মূল কারণ হলো- এ সম্পর্ক ধরে রাখার জন্য যারা কাজ করছিলেন; তাদের মধ্যকার অনেকেই মারা গেছেন। এ বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর মারা গেলেন আল্লামা শাহ আহমদ শফী। তারও আগে সরকারের ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাবেক ধর্মবিষয়ক সম্পাদক শেখ আবদুল্লাহ এবং প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব জয়নুল আবেদীন মারা যান। এরপর সম্পর্ক রক্ষায় ঘাটতি দেখা দেয়। বিশেষ করে আল্লামা শফীর মৃত্যুর পর হেফাজত চলে যায় একরকম সরকারবিরোধী পন্থীদের নিয়ন্ত্রণে।

গত ১৫ নভেম্বর হেফাজতের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে জুনায়েদ বাবুনগরী আমির ও নূর হোসাইন কাসেমীকে মহাসচিব করে ১৫১ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে আল্লামা আহমদ শফীর ছেলে সাবেক প্রচার সম্পাদক আনাস মাদানীসহ প্রায় ৬১ জনকে বাদ দেওয়া হয়। যাদের বেশিরভাগই শফিপন্থী বা আওয়ামীপন্থী। যার কারণে সম্পর্কের দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে। এরই মধ্যে আবার হেফাজত ভাঙার আভাস পাওয়া গেছে। এতে সরকারপন্থী একটি হেফাজত গড়ে ওঠার লক্ষণ দেখা দিয়েছে। আগামী ২১ নভেম্বর আল্লামা আহমদ শফীর স্মরণে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল ডেকেছেন তার ভক্ত ও অনুসারীরা। সেই দোয়া মাহফিলের পরই এ বিষয়টি আরও প্রতিভাত হবে। এ বিষয়ে হেফাজতের সাবেক নায়েবে আমির ও সাবেক এমপি মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস খোলা কাগজকে বলেন, ‘আমরা এখনই বিকল্প কিছু ভাবছি না। পাল্টা কিছু করারও সময় আসেনি। তবে আগামী শনিবার আল্লামা শফীর স্মরণে আমরা দোয়া মাহফিল করব। তারপর বৈঠক করে করণীয় ঠিক করব।’

হেফাজতের পাল্টা কমিটির নেতৃত্বে যারা
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, হেফাজতের সদ্যঘোষিত কমিটি থেকে বাদপড়া শফিপন্থী প্রায় ৬১ নেতা এক হয়ে নতুন কমিটি করার পরিকল্পনা করছেন। সূত্র বলছে, শনিবারের দোয়া মাহফিলের পর যে কোনো সময় হেফাজতের পাল্টা কমিটি আসতে পারে। তাতে সম্ভাব্য আমির থাকছেন মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস, তিনি হেফাজতের সাবেক নায়েবে আমির, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রধান ও চারদলীয় জোটের সাবেক এমপি। এ ছাড়াও আমির হিসেবে আলোচনায় আছেন কওমি শিক্ষাবোর্ড; আল হাইতুল উলিয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান, তিনি যাত্রাবাড়ী মাদ্রাসার প্রধান ও সরকারপন্থি আলেম হিসেবে পরিচিত। অথবা ঢাকার ফরিদাবাদ মাদ্রাসার প্রিন্সিপ্যাল মাওলানা আবদুল কুদ্দুছও আসতে পারেন আমির হিসেবে। তিনি আল হাইতুল উলিয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশের মহাসচিব ছিলেন। এই গ্রুপে মহাসচিব হিসেবে আলোচনায় আছেন হেফাজতের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ বা সাবেক প্রচার সম্পাদক শফিপুত্র আনাস মাদানী। মাওলানা মইনুদ্দিন রুহীসহ জামায়াতবিরোধী আলেমরা আসবেন এর নেতৃত্বে।

এদিকে হেফাজত ভাঙছে- এটি স্পষ্ট করে বললেও ‘আওয়ামী লীগ-হেফাজত সম্পর্ক’ নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি কেউই। তবে হেফাজত শিগগিরই সরকারের কব্জায় আসছে- এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এ ইস্যুতে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে কেউই রাজি হননি।

You might also like