ট্রাম্প শঙ্কা বাড়ালেও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তুতি চলছে

14

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ সোনারদেশ২৪:

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী ও সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জয়ী হলে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে না পারলেও তাঁর শীর্ষ কর্মকর্তাদের উদ্যোগে প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রশাসন।

মার্কিন রাজনীতিতে প্রতি চার বছর পরপর ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়টি স্বাভাবিক পন্থাতেই হয়। ক্ষমতা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে পরবর্তী নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট তাঁর অভিষেকের আগে যাবতীয় প্রস্তুতির জন্য তিন মাসের কম সময় পান। এ ক্ষেত্রে নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের চেয়ে ঢের বেশি প্রস্তুতির প্রয়োজন হয় বিদায়ী প্রশাসনের। এবার এ ধরনের একটি ক্ষমতা হস্তান্তর হতে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। ক্ষমতা হস্তান্তর বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানায়, মনে হচ্ছে এবার ক্ষমতা ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে জো বাইডেনের কাছে হস্তান্তর হবে। কোভিড–১৯ মহামারিসহ বিদ্যমান পরিস্থিতি এবং এখন পর্যন্ত হওয়া সব জনমত জরিপে বাইডেনের এগিয়ে থাকা অন্তত তেমন ইঙ্গিতই দিচ্ছে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কয়েকবার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে প্রশ্ন করেছে। কিন্তু তিনি এই প্রশ্নের কোনো সোজাসাপ্টা উত্তর দেননি। বরং প্রশ্নটিকে বারবার কৌশলে এড়িয়ে তিনি নির্বাচনে সম্ভাব্য জালিয়াতির বিষয়ে কথা বলেছেন। এই ভোট জালিয়াতির অভিযোগ উত্থাপনের সময় এমনকি তিনি কোনো তথ্য–উপাত্ত বা প্রমাণও হাজির করেননি। মোদ্দা কথা শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের ইস্যুটিকেই প্রশ্নের আওতায় রেখে দিয়েছেন। এই যখন অবস্থা তখন তাঁর চিফ অব স্টাফ মার্ক মেডোস ও নীতি সমন্বয়বিষয়ক ডেপুটি চিফ অব স্টাফ ক্রিস লিডেল বাইডেনের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে সম্ভাব্য ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে কাজ করছেন। কিন্তু এটি বাইডেন ও তাঁর শিবিরকে তেমন আশ্বস্ত করতে পারছে না।

ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে কাজ করছেন এমন কয়েকজনের বরাত দিয়ে সিএনএন জানায়, হোয়াইট হাউসের দিক থেকে চলমান সহযোগিতা সত্ত্বেও বাইডেনের দল ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের দিক থেকে ক্ষমতা হস্তান্তরে সম্ভাব্য বাধার আশঙ্কা এবং সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বাইডেনের দিক থেকে ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পর্কিত সম্ভাব্য বিভিন্ন আইনি জটিলতাকে বিবেচনায় নিয়ে পুরো বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার দায়িত্বটি পালন করছেন তাঁর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও হোয়াইট হাউসের সাবেক কৌঁসুলি বব বয়ার। ভোট ও নির্বাচন সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে সম্ভাব্য সমস্যাগুলো মোকাবিলায় বাইডেন একটি বড় কৌসুলি দল গঠন করেছেন, যার নেতৃত্বে রয়েছেন বব বয়ার ও বাইডেনের প্রচার দলের উপদেষ্টা ডানা রেমুস।

সিএনএন জানায়, ক্ষমতা হস্তান্তর বিষয়ে বাইডেনের গড়া বিশেষ দল এ নিয়ে কাজ শুরু করেছে গত গ্রীষ্মে। এই পুরো কার্যক্রম তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে আছেন তাঁর প্রচার দলের দুই কো–চেয়ার জেফ জিয়েন্টস ও টেড কফম্যান। এর মাধ্যে সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্টের কয়েক দশকের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করা কফম্যান ক্ষমতা হস্তান্তর বিষয়ক একজন বিশেষজ্ঞও। বাইডেন ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর কফম্যান ডেলাওয়্যার অঙ্গরাজ্যের সিনেটর হিসেবেও কিছু দিন দায়িত্ব পালন করেন। এই দলে আরও রয়েছেন বাইডেনের প্রচার দলের উপদেষ্টা ও হোয়াইট হাউসের সাবেক যোগাযোগ পরিচালক অ্যানিটা ডান। রয়েছেন নিউ মেক্সিকোর গভর্নর লুজান গ্রিশাম ও প্রতিনিধি পরিষদে লুইজিয়ানার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি সেড্রিক রিচমন্ড।

ক্ষমতা হস্তান্তরের ইস্যুটি নিয়ে বাইডেনের প্রচার দল দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করছেন। এক সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানায়, এ বিষয়ে গঠিত বিশেষ দলে অন্তত ১৫০ জন রয়েছেন। ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রয়োজন পড়লে অভিষেকের আগে এই দলের পরিসর বেড়ে তা ৩০০ জনের দলে রূপান্তরিত হবে। বাইডেনের এই ক্ষমতা হস্তান্তর–বিষয়ক দলটি ওয়াশিংটনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরে বসে কাজ করার কথা। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে অন্য সবকিছুর মতোই এ দলের সদস্যরা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কাজ করছেন। নির্বাচনের পরও হয়তো তাঁরা এভাবেই কাজ করবেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা।

মার্কিন প্রেসিডেন্সি হস্তান্তরের আগের রীতি মেনেই বাইডেনের এ দল সবকিছু করছে। এ তালিকায় যেমন রয়েছে বাইডেন বিজয়ী হলে হোয়াইট হাউসের সম্ভাব্য কর্মকর্তাদের তালিকা প্রণয়ন, নীতি পরিবর্তন সংক্রান্ত গবেষণা, তেমনি রয়েছে ক্ষমতায় গেলে বাইডেন তাঁর প্রেসিডেন্সির প্রথম কয়েক দিনে কী কী নির্বাহী আদেশ দেবেন, তার পরিকল্পনা প্রণয়নের মতো বিষয়ও।

ক্ষমতায় গেলে কেমন মন্ত্রিসভা গঠন করবেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে বাইডেন সম্প্রতি বলেছেন, তাঁর মন্ত্রিসভা হবে অনেকটা কাউন্টির মতো। অর্থাৎ, ক্ষমতায় গেলে বাইডেন একটি বৈচিত্র্যপূর্ণ মন্তিসভা গঠন করবেন, যেখানে নারীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি থাকবে। একই সঙ্গে আদর্শিক ও ভৌগোলিক দিক থেকেও এটি হবে বৈচিত্র্যময়। এমনকি শীর্ষ কর্মকর্তা স্তরে সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সুসান রাইস, ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের সাউথ বেন্ড শহরের সাবেক মেয়র পিট বুটিজিজ, সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল স্যালি ইয়েটসের মতো নেতার দেখা মিলতে পারে।

নির্বাচনে জয়ী হলে বাইডেনকে এমনিতেই অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এর মধ্যে আদর্শিকভাবে বিভাজিত নিজ দলের বিভিন্ন অংশকে সন্তুষ্ট রাখাটা এক বড় চ্যালেঞ্জ। দলের উদারনৈতিক অংশটি বাইডেনের সম্ভাব্য প্রশাসনে কে কী দায়িত্ব পাবেন এবং এই সম্ভাব্য দায়িত্বপ্রাপ্তদের কারা বাছাই করছেন, তাঁদের দিকে কড়া নজর রাখছে। এই বিশেষ দলে বাইডেনের এক সময়ের শীর্ষ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা এবং বাইডেন–স্যান্ডার্স ‘ইউনিটি টাস্ক ফোর্সের’ সদস্য জ্যারেড বার্নস্টেইনের উপস্থিতি প্রগতিশীল অংশটিকে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। প্রগতিশীলদের আশ্বস্ত করতে দলটিতে রাখা হয়েছে জলবায়ু ও পরিবেশ ইস্যুতে সর্বজন শ্রদ্ধেয় এবং সেন্টার ফর আর্থ, এনার্জি অ্যান্ড ডেমোক্রেসির নির্বাহী পরিচালক সেসিলিয়া মার্টিনেজকে রাখা হয়েছে।

একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের দিক থেকেও। ট্রাম্প মুখে যা–ই বলুন না কেন, তাঁর প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা কয়েক মাস আগে থেকেই রীতি মেনে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন, যাতে প্রয়োজন পড়লে কোনো বিপাকে পড়তে না হয়। ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য কংগ্রেসকে প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন দিতে এবং ফেডারেল বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করতে কাজ করছেন ক্রিস লিডেল। জানুয়ারিতে যদি নতুন প্রশাসনের অধীনে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগের প্রয়োজন হয়, তবে যেন সব ধরনের প্রস্তুতি আগে থেকেই থাকে সে ব্যবস্থা করছেন তিনি। একই সঙ্গে বাইডেনের শীর্ষ উপদেষ্টাদের নিরাপত্তা ছাড়পত্র পেতে বিচার বিভাগ ও এফবিআইয়ের সঙ্গেও কাজ করা হচ্ছে, যাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় তাঁদের প্রয়োজনীয় গোপনীয় তথ্য সরবরাহ করা যায়।

ক্রিস লিডেল এর আগেও এ নিয়ে কাজ করেছেন। ২০১২ সালে বারাক ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচনের সময় রিপাবলিকান প্রার্থী মিট রমনির হয়ে তিনি ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পর্কিত প্রস্তুতির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এবার অবশ্য লিডেল আনুষ্ঠানিক নেতৃত্বে নেই। আনুষ্ঠানিকভাবে এ কাজের নেতৃত্বে রয়েছে হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ মার্ক মেডোস। একই সঙ্গে রয়েছেন হোয়াইট হাউসের কৌঁসুলি প্যাট সিপোলোন, বাজেট বিভাগের প্রধান রাসেল ভাউটসহ হোয়াইট হাউস ও প্রেসিডেন্টের দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা।

সার্বিক বিষয়ে পার্টনারশিপ ফর পাবলিক সার্ভিসের সেন্টার ফর প্রেসিডেনশিয়াল ট্রানজিশনের পরিচালক ডেভ মারচিক সিএনএনকে বলেন, ক্ষমতা হস্তান্তর বিষয়ের নির্দেশনাটি আছে ১৯৬৩ সালে প্রণীত প্রেসিডেনশিয়াল ট্রানজিশন অ্যাক্টে। এতে ক্ষমতা হস্তান্তরে বিলম্ব হলেও এই নিশ্চয়তা দেওয়া হয় যে, নির্বাচনের পরও প্রার্থীরা সরকারের দিক থেকে সব ধরনের সেবা পাবেন। তিনি বলেন, ‘ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য হাতে আছে আর মাত্র ৭৮ দিন। ফলে প্রতিটি দিনই গুরুত্বপূর্ণ। নানা পরিস্থিতির কারণে মনে হচ্ছে, এবারের ক্ষমতা হস্তান্তর (যদি প্রয়োজন হয়) হবে ১৯৩২ সালের পর সবচেয়ে ঘটনাবহুল। সেই মহামন্দার বাস্তবতায় তখনকার প্রেসিডেন্ট হার্বার্ট হুভার ও নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টর মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে বেশ জটিলতা দেখা দিয়েছিল।’

বলার অপেক্ষা রাখে না, এবারও তেমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। করোনায় পর্যুদস্ত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, বেকারত্ব আকাশচুম্বি, সামাজিক অস্থিরতা ভয়াবহ পর্যায়ে রয়েছে, রয়েছে বিভাজন ও বৈষম্যের অভাবনীয় বিস্তার। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন না, যখন ‘প্রাউড বয়েজের’ মতো নিজের কট্টর ও মারমুখী সমর্থক গোষ্ঠীকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান, তখন এ নিয়ে শঙ্কা না থাকার কোনো কারণ নেই।

You might also like