নিজ দেশে পরবাসী নবীননগর খালপাড়ার বাসিন্দারা

24

সোনারদেশ২৪: ডেস্কঃ

মেহেরপুর সদর উপজেলার ছোট্ট গ্রাম নবীননগর খালপাড়া। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এ গ্রাম ছিটমহলের মতোই। সুবিধাবঞ্চিত এ গ্রামের মানুষরা যেন নিজ দেশে পরবাসী। বিভিন্ন সময়ে জনপ্রতিনিধিরা তাদের বুড়িপোতা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে বাস করার অনুরোধ জানালেও তারা বাপ-দাদার ভিটা আঁকড়ে আছেন।

মেহেরপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ১১৬ নম্বর মেইল পিলার সংলগ্ন সদর উপজেলার বুড়িপোতা ইউনিয়নের নবীননগর খালপাড়া গ্রাম। দেশভাগের পর গ্রামের মাত্র ৪০টি পরিবার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাসিন্দা হয়। তখন থেকে ৭৩ বছর ধরে সুবিধাবঞ্চিত নবীননগর খালপাড়া গ্রাম।

বুড়িপোতা ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের নবীননগর খালপাড়া অংশে ভোটার ৮৪ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ৩৮ জন ও নারী ৪৬ জন।

ওই গ্রামের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম (৮৬) জানান, অনেক বছর আগে জমিদার নবীন বাবু এই এলাকায় অনুগত প্রজাদের বসিয়ে জমিদারি পরিচালনা করতেন। তার নাম অনুসারে গ্রামের নাম হয় নবীননগর। এই গ্রামে তার প্রজা ছিল ২৪০টি পরিবার। দেশভাগের সময় ২০০ পরিবার ভারতে, ৪০ পরিবার পূর্ব পাকিস্তান অংশে পড়ে। সে সময় থেকেই পাকিস্তান অংশের নাম হয় নবীননগর খালপাড়া। তখন থেকে প্রায় ৫০ বছর ধরে কাঁটাতাদের বেড়া না থাকায় একই গ্রামের (নবীননগর) দুই দেশের অংশের বাসিন্দারা মিলেমিশে বাস করতেন। কিন্তু কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পর তারা আলাদা হয়ে যান। দীর্ঘ সময় বসবাস করেও নাগরিক সুবিধা না মেলায় কয়েকটি পরিবার এ গ্রাম ছেড়ে মেহেরপুর শহর, বুড়িপোতা কিংবা বাড়িবাঁকা গ্রামে জায়গা কিনে বাড়ি করেছেন। নানা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও একই স্থানে বাংলাদেশের বাসিন্দা হয়ে বর্তমানে বাস করছে ৩৫টি পরিবার।

তিনি আরও জানান, কাঁটাতারের বেড়ার ওপারের নবীননগর গ্রামের বাসিন্দারা ভারতের নদীয়া জেলার তেহট্ট থানার নবীননগর সাব-কোম্পানি ক্যাম্পের বিএসএফের নজরদারিতে এবং নবীননগর খালপাড়াবাসী বাংলাদেশের মেহেরপুর সদর উপজেলার বুড়িপোতা কোম্পানি ক্যাম্প বিজিবির নজরদারিতে থাকেন। মাঝে মাঝে পুরাতন নবীননগর গ্রামে পতাকা বৈঠক করে বিজিবি-বিএসএফ।

নবীননগর খালপাড়া গ্রামের বাসিন্দা হিসাব আলী (৬৫) জানান, ১৯৯৭ সালের অক্টোবর মাসে ভারত সরকার নবীননগর গ্রামের ভারতের অংশের ২০০ পরিবারকে সরিয়ে নেয় ভারতের আরো ভেতরে। ২০০৩ সালে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের সময় নবীননগর গ্রামের ভারতের ওই অংশ কাঁটাতারের বেড়ার ভেতরে চলে যায়। বাকি ৪০ ঘর লোক নবীননগর খালপাড়ায় বাস করছেন। ভারত সরকার তাদের অংশের মানুষগুলোকে এমনভাবে সরিয়ে নিয়েছে যে, একই পরিবারের সদস‌্যরা এখন দুই দেশের বাসিন্দা হয়েছেন।

আমেনা খাতুন (৭০) জানান, নবীননগর খালপাড়ার মানুষ কৃষিকাজ ও গরু-ছাগল পালন করে জীবিকা নির্বাহ করেন। গত কয়েক বছরে গ্রামের কয়েকজন যুবক কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে গেছেন।

স্থানীয় বিদ‌্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম জানান, বর্তমানে এ গ্রামের বাসিন্দা প্রায় ১৭৫ জন। কমপক্ষে তিন কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা পাড়ি দিয়ে পাকা রাস্তায় উঠতে হয়। এরপর নছিমন- করিমনে করে মেহেরপুর শহরে পৌঁছাতে হয়। গ্রামটিতে নেই বাজার ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। খেলার মাঠ নেই। খালপাড়ার শিশু-কিশোর-তরুণরা ভারত অংশে খোলা জায়গায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খেলাধুলা করত। বিএসএফর পক্ষ থেকে কড়াকড়ি আরোপ করায় তাদের খেলা বন্ধ হয়েছে।

তিনি আরো জানান, ১৯৯২ সালে স্থাপিত নবীননগর কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বর্তমানে নবীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শিক্ষার্থীদের কেউ প্রাথমিক সমাপনী শেষ করলে তিন কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা পাড়ি দিয়ে নিকটবর্তী শালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যেতে হয়।

বুড়িপোতা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ মুকুল বলেন, ‘আমি বহুবার চেষ্টা করেছি নবীননগর খালপাড়ার মানুষগুলোকে বুড়িপোতা ইউনিয়নের বাড়িবাঁকাসহ অন্য কোনো গ্রামে সরিয়ে নিতে। কিন্তু তাদের কাছ থেকে সাড়া পাইনি।’

বুড়িপোতা ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান শাহ জামাল বলেন, ‘নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই ওই গ্রামের লোকগুলোকে সরিয়ে নিতে চেয়েছি। কিন্তু তারা ওই স্থান থেকে সরতে চান না।‘

মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘প্রথম নির্বাচিত হওয়ার পর ২০১৪ সালের ৩০ মে আমি ওই গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগের উদ্বোধন করেছি। ওই গ্রামে ডিস সংযোগ দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য উন্নয়ন কার্যক্রম হাতে নেওয়া হচ্ছে।’

You might also like