ছোট রাজপুত্র : এক নিঃসঙ্গ গ্রহচারী

10

শিল্প ও সাহিত্য ডেস্কঃ সোনারদেশ২৪:

যে কোনো এক সকালে কাঁধে একখানা ব্যাকপ্যাক নিয়ে নিরুদ্দেশ যাত্রায় চলে যাওয়ার মতো বিচিত্র ইচ্ছে বোধকরি এই পৃথিবীতে অনেকেরই আছে। সে ইচ্ছে সবাই পূরণ করতে না পারলেও; বহু বছর আগে ভিনগ্রহের এক ছোট রাজপুত্র পেরেছিল ঠিকই। আর নানা গ্রহের অদ্ভুত সব অধিবাসীদের সাথে পরিচিত হয়ে উপভোগ করছিল তার ভ্রমণ। ‘সোজা গেলে বেশি দূর যাওয়া যায় না’ এমন এক ছোট্ট গ্রহ থেকে রাজপুত্র শুরু করে তার যাত্রা। জানা কথা, মঙ্গল, শুক্র, নেপচুন ও পৃথিবীসহ নানা চেনা গ্রহ-উপগ্রহ সৌরজগতে থাকলেও পাশাপাশি আছে শত শত বেনামী গ্রহ। এমনই এক গ্রহ থেকে এসেছিল সে। আমরা যদি বয়স্ক মানুষের মতো ভেবে দেখি; তাহলে এখন হয়তো প্রশ্ন করে বসবো, কত বড় আয়তন সেই গ্রহের, কত জনসংখ্যা, ওজন ক্যামন কিংবা নাম কী? আর যদি মন রাখতে পারি সতেজ ও শিশুসুলভ তাহলে হয়তো বলবো, সেই গ্রহে আকাশের রঙ কি নীল? প্রজাপতি উড়ে? বৃষ্টি হয় নাকি বর্ষাকালে? সেইসব প্রশ্ন একপাশে রেখে বরং এইটুকু আপাতত জেনে নেওয়া যাক, রাজপুত্রের নক্ষত্রকে ডাকা যাবে বি-৬১২ নামে।

সাহারা মরুভূমির ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া এক বৈমানিক যখন বিমান দুর্ঘটনায় পতিত হন; তখন সেখানেই তার দেখা হয়ে যায় চারপাশে রহস্য ঘনিয়ে ওঠা নির্লিপ্ত এক রাজপুত্রের সাথে। মার্কিন দেশে যখন ভর দুপুর; ফরাসিতে তখন সন্ধ্যা নামে, এমন এক দোলাচলের সময়ে রাজপুত্র চায় বৈমানিককে নিয়ে সূর্য ডোবার পালাবদল দেখতে। বৈমানিক জানতে পারে রাজপুত্রের গ্রহসহ তার নানা অভিযানের কথা। আর ‘থ্রু দ্য লুকিং গ্লাস’ এর মতো রাজপুত্র ঘুরে আসে এক বৃদ্ধ রাজার অধিবাসে, যে ভাবতো ‘সকল মানুষমাত্রেই তার প্রজা’। আরেক গ্রহে সে খুঁজে পায় এক আত্মভিমানী লোক; যে হাততালির মাধ্যমে টুপি খুলে প্রশংসা ও স্তুতিবাক্য শুনতে ইচ্ছুক। এরপর একে একে আসে মদ খাওয়ার লজ্জা ভুলে যেতে চাওয়া মাতাল, যোগফল নির্ভুল করতে চাওয়া ধনী ব্যবসায়ী, ল্যাম্প পোস্টের বাতি জ্বালাবার লোক। দেখা দেয়; মোটা মোটা বই লেখা এক ভৌগলিক, যে কেবল দেশাবিস্কারকের কাছ থেকে জ্ঞানটুকুই টুকে নেয় কিন্তু নিজে কোথাও যায় না। সবশেষে সে পায় নীল-সবুজ গ্রহ পৃথিবীকে। সেখানে পরিচিত হয় সাপ, ফুল, গোলাপ বাগান, একাকী পর্বতমালা ও এক খেঁকশেয়ালের সাথে। উপন্যাসের প্লট টুইস্টের মতো জানা যায়, নিজের গ্রহের প্রিয় ও একমাত্র লাল গোলাপের সাথে অভিমান করে রাজপুত্র নেমে এসেছে পৃথিবীতে। সাথে সাথেই যেন এই অভিমান, বিচ্ছেদ আর টকটকে একটি লাল গোলাপ পাঠকদের মনে করায় ১৭৪০ সালে প্রথম প্রকাশিত ফরাসি ঔপন্যাসিক গ্যাব্রিয়াল সুজান দে ভেলনুয়েভার লেখা বিশ্ব বিখ্যাত আরেক রূপকথা ‘সুন্দরী ও কদাকার’ এর স্মৃতি। ফলে এক গল্প নদীর মতো বাঁক বদল করে চলে যায় অন্য গল্পে। প্রচণ্ড অমিলের সমীকরণে জেগে ওঠে কিছু মিল।

সেই রূপকথায় এক বৃদ্ধ সওদাগর ঝড়ের কবলে পড়ে আশ্রয় নেয় জনশূন্য, রহস্যময় এক প্রাসাদে। রাজ্যের মুখরোচক খাওয়া, আরামদায়ক ঘুম ও বিশ্রামের সুযোগ সুবিধা নিয়ে পরদিন বৃদ্ধ যখন মনে মনে প্রাসাদের মালিককে ধন্যবাদ জানিয়ে বাড়ির পথ ধরতে যায়, তখনই তার চোখ পড়ে এক ফুল বাগানের দিকে। আর তার মনে পড়ে; সব সন্তানেরা তার কাছে দামী পোশাক, গহনা, উপহার সামগ্রী চাইলেও সবচেয়ে ছোট কন্যা, বইপড়ুয়া বেলা চেয়েছে একটি টকটকে লাল গোলাপ। যে ফুলটি তাদের গ্রামে পাওয়াই যায় না। তাই বাগানের সবচেয়ে সুন্দর গোলাপটি ছিঁড়ে নেয় সে, আর তখনই বজ্রের মতো প্রাসাদের ভেতর থেকে জান্তব হুঙ্কার দিয়ে ওঠে কেউ। এক কিম্ভূতকিমাকার কুৎসিত চেহারার জন্তুর হাতে আটকা পড়ে সওদাগর। ক্ষমা প্রার্থনার পরেও কুৎসিত জন্তুটি তাকে ছাড় দেয় না। বরং জানায় এক শর্তে সে পাবে মুক্তি; যদি বৃদ্ধের কোনো সন্তান এসে তার বদলে জিম্মি থাকে প্রাসাদে। আর এমন বিচিত্র শর্তের পরিণতি হিসেবে নিজের পিতাকে বাঁচাতে রাজপ্রাসাদে এসে ধরা দেয় বেলা। সুনসান প্রাসাদে কুৎসিত জন্তুটির পাশাপাশি আতংকিত হয়ে বসবাস করার সময়ে কেবল একটি স্থানই থাকে; যেখানে বেলা খুঁজে পায় নিজের শান্তি ও ভালোলাগা। তা হলো, প্রাসাদের বিশাল বড় লাইব্রেরি। যেখানে আছে শত শত বই। আর এভাবেই দিন পার করতে করতে বেলা ও কুৎসিত জন্তুটি কৌতূহলী হয়ে ওঠে পরস্পরের প্রতি। হয়ে যায় বন্ধু। প্রকৃতপক্ষে জন্তুটি ছিল এক অভিশপ্ত রাজপুত্র; যে হারিয়েছিল নিজের আসল রূপ, আত্ম-অহমের কারণে। কুৎসিত অবয়বের আচ্ছাদন পেরিয়ে কেবলমাত্র সত্যিকারের ভালোবাসা পেলেই সে ফিরতে পারবে স্বরূপে। নয়তো রাজপুত্রের জীবনের সময়ঘড়ি থেমে যাবে, একটি লাল গোলাপের মুষড়ে পড়ার সাথে সাথেই। সেই গোলাপের সাথে জুড়ে থাকা দু’জনের রূপকথা তখন আমাদের চোখে যেন হয়ে ওঠে সময়ের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত গল্প। মনে হয় আসলে এখানে কোনো মিথ, ম্যাজিক কিংবা কল্পনা নেই। যুগে যুগে মানুষের মাঝেই লুকিয়ে থেকেছে অমানুষ, অমানবিকতার বেশে সেঁটে থেকেছে নানা মুখোশ ঠিক কুৎসিত জন্তুটির মতোই। যার ফলে তারা ভুলেছে অন্যকে ভালোবাসতে। উপকার করতে। মানবিক হতে। রূপকথার এই জন্তুটি যেন প্রথাগত সমাজ ব্যবস্থা ও সৃষ্টির সেরা জীবের আত্মকেন্দ্রিকতার প্রতীক। যেখানে দরকার বেলার মতো আলোকিত, উদার কেউ। যে ছড়াতে পারে জ্ঞান ও ধৈর্য্যের সুবাতাস, যে চায় বাইরের রূপটুকু এক নিমিষে সরিয়ে অন্তরের ভেতরে আলো ফেলতে। যে বই পড়ে, যার প্রসারিত দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নতুন করে তাজা হয়ে ওঠে কুৎসিত জন্তুর মন থেকে শুরু করে মুষড়ে পড়া গোলাপ ফুলটিও।

‘সুন্দরী ও কদাকার’ এর গল্প যেমন করে আমাদের সামনে আটপৌরে রূপকথাকে করে ফেলে আধুনিক, তেমন করেই মনে হয় ভিনগ্রহের রাজপুত্র ও তার লাল গোলাপের কাহিনীরও আছে ভিন্ন আঙ্গিক। ঠিক যেন পৃথিবীতে থাকা সাপের বলা একটি হেয়ালিপূর্ণ কথার মতো সত্য, ‘লোকেরা বাড়িতেও প্রত্যেকে একা’। কিংবা বয়স্ক মানুষদের মতো একপেশে দর্শন, যেখানে হৃদয়ের চেয়ে সংখ্যাই তাদের কাছে বেশি মূল্যবান। আর খোঁড়া সিস্টেমের যাঁতাকলে হাঁসফাঁস করতে থাকা পাঠক বুঝতে পারে আস্ত হাতি গিলে ফেলা বোয়া অজগরের ছবিটির মতো তাদেরকের গিলে নেবে কোনো না কোনো সিস্টেম যদি শুরুতেই ‘বাওবাব’ নামের ধ্বংসাত্মক ও বিষাত্মক গাছকে উপড়ে না ফেলা হয় তো। আর এই ফাঁকে আদেশ দিতে ভালোবাসা, পার্থিবতা, কৌতুক ও নিষ্ঠুরতা প্রিয় নানা গ্রহবাসীদের উদ্ভট সব নিয়ামবলীর মাঝে; একাকী সূর্যাস্ত উপভোগ করতে চাওয়া বিষণ্ণ রাজপুত্রকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানায় খেঁকশেয়ালটি। জানায় কেন কাউকে পোষ মানাতে হয়। কেন পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ থাকার পরেও নির্দিষ্ট কেউ আমাদের চোখে হয়ে ওঠে অনন্য। কেন তার চিন্তা ও যাপনকে আমরা সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ডি অথচ ইতিবাচক কেয়ার ইমোটিকনসের মতো আঁকড়ে ধরতে চাই। সাদা চোখে সে পৃথিবীর অন্যসব মানুষের মতো হবার পরেও তার গায়ের ঘ্রাণ, চলার শব্দ, তাকানো কিংবা কন্ঠ হয়ে ওঠে আমাদের পরিচিত অংশ। কারণ আর কিছুই নয় ফার্সি কবি জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমির মতো বলা যায়, ‘যা কিছু আমরা খুঁজি তা খুঁজে নেয় আমাদেরকেও’। আমরা যাকে পোষ মানাই তার কাছে নিজেও মেনে নেই পোষ। আর এক ভিন্নতর যোগাযোগ শুরু হয়ে যায় যা, খালিচোখে দেখাই যায় না। অথচ ছোট রাজপুত্র বইটিই আমাদের জানায়, যা কিছু চোখে দেখা যায় না কিন্তু অনুভব করা যায় তাই এই বিশ্বে তুমুল শক্তিশালী, সবচেয়ে খাঁটি।

ছোট রাজপুত্র ভাবে, সে তার গ্রহে গোলাপটি প্রথম দেখে ভেবেছিল এমন সুন্দর ফুল আর কোথাও নেই। ফুলটিও স্বীকার করেছিল সারাবিশ্বে তার মতো কাউকে পাওয়া যাবে না, কিন্তু খেঁকশেয়ালের সাথে পোষ মানানো উত্তাল বন্ধুত্বের সময়ে রাজপুত্র পৃথিবীতে পেয়ে যায় এমন এক বাগান যেখানে আছে শুধুই গোলাপ। প্রথমে নিজেকে প্রতারিত মনে হলেও নতুন করে বুঝতে পারে আসলেই তার ফুলের কথাটি ছিল সত্য। সহস্র ফুল বাগানে থাকলেও তার ফুল ছিল কেবল একটিই। এভাবেই একের পর এক উপলব্ধির গিঁট খুলতে খুলতে রাজপুত্র এগোতে থাকে সামনে।

‘বয়স্কমাত্রই তো একদিন ছোট ছিল’ এ কথাটা মনে রাখে না অনেকে, চোখের আড়ালেই আসল চোখটা থাকে লুকিয়ে তাও সময়ের সাথে ভুলে যায় সকলে। রাজপুত্রের অভিযান যেমন তাকে দেয় মনোরম নানা বোধ, মরুভূমিতে আটকে থাকা বৈমানিকও যেন এক পর্যায়ে পেতে থাকে নতুন জীবন দর্শন। যেন বস্তুবাদী দুনিয়ার দেয়াল শুরু করে ভাঙতে। আর গমখেতের ওপর দিয়ে তীব্র বাতাস বয়ে চলা সময়ে স্মৃতিচিহ্ন রেখে বিদায় নেয় খেঁকশেয়াল। প্রায় একইভাবে বিদায় নেয় বৈমানিকের কাছ থেকে রাজপুত্রও। লম্বা সময় পেরিয়ে বৈমানিক ফিরে আসে নিজ দেশে, কিন্তু জানতে পারে না কী হলো এরপর সেই ছোট রাজপুত্রের। হয়তো সে চলে গিয়েছে তার অচেনা গ্রহে, হয়তো হারিয়েছে পথ। সাপে কেটেছে কিংবা তার গোলাপ ফুলটিকে আর অক্ষত পায়নি বলে সে তলিয়েছে মেঘের আড়ালে। পাঠকের আর পরিণতিটুকু জানা হয় না। তবে এক্সপ্রেস ট্রেন রাতের অন্ধকার চিরে যেভাবে চলে যায় আলো ছড়িয়ে, কিংবা কমলাপুর রেলস্টেশনের পাশে যেভাবে পথশিশুদের মুখে ফুটে ওঠে বিকেলের রোদ, যেভাবে আত্মহত্যা প্রবণ জাপানী লোকগুলো অকিগহরা জংগলে যায় মিলিয়ে, সেভাবেই পাঠকের মনে ভালো-মন্দ উভয় আশংকা কাজ করতে থাকে। পাঠক যেন বাস্তব, অবাস্তব, পরবাস্তবতাকে গেঁথে ফেলে একই সূতায়। ছোট ও বড়ো মানুষের মাঝের দেয়াল গুঁড়িয়ে; সেতু বানিয়ে, জনপদ থেকে জনপদ ঘুরে বেড়াতে থাকে বি-৬১২ গ্রহের এক নিঃসঙ্গ গ্রহচারীর মতো।

তবে আশার কথা, গভীর রাতে আকাশে পৃথিবীর সুন্দরতম, বিষণ্ণতম যে দৃশ্য জেগে ওঠে তাতে পাঠক রাজপুত্রকে খুঁজে না পেলেও তার আবছায়া যেন পরবর্তীতে বইয়ের দোকান কিংবা অন্তর্জালে বিল ওয়াটারসনের কমিক বুক ‘কেলভিন এ্যান্ড হবস’ -এ পেয়ে যায়। ছয় বছর বয়সী কেলভিনকে মনে হয় বৈমানিকের শৈশব আর তার কাল্পনিক বন্ধু হবসকে মনে হয় সোনালি চুলের রাজপুত্র। তিব্বতের টিনটিন, চাচা চৌধুরী যতই রাঙিয়ে দিয়ে যাক; ফেলে আসা ছেলেবেলার ঝোলা কাঁধে পুরানো শহরে হেঁটে যাওয়া কোনো এক চিরতরুণ গল্পবুড়োর মতো ‘দ্য লিটল প্রিন্স’ বা ছোট রাজপুত্রকে জীবনে চেনা যায় বার বার। বন্ধ চোখে বাতাসে কান পাতলে শোনা যায় তার প্রাণোচ্ছল হাসি। সংখ্যাতত্ত্বে জর্জরিত পুঁজিবাদের জীবনে আজও এক পলক থমকালে; যুক্তির মেঘগুলোকে ঠেলে পেছনে ফেলে একটু দাঁড়িয়ে অনুভব করা যায়, ভেতরের শিশুটিকে বাঁচিয়ে রাখা আর একটি লাল গোলাপের জন্য খাঁটি ভালোবাসা বাদে হয়তো বেঁচে থাকার কোন দীর্ঘ অর্থ নেই এই পৃথিবীতে।

You might also like