
২০২৬
1 বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন বলে মন্তব্য করেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রভাবশালী সাপ্তাহিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট। আন্তর্জাতিক এই সাময়িকীর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সাধারণ নির্বাচনের পর বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানই শীর্ষ দাবিদার।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত সাম্প্রতিক সংখ্যার এক বিশ্লেষণে দ্য ইকোনমিস্ট লিখেছে, 'খ্যাতনামা এক রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান, ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান আসন্ন নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন।'
বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়, এই নির্বাচন হচ্ছে ১৮ মাস আগে সংঘটিত এক ‘বিপ্লব’-এর পর প্রথম জাতীয় নির্বাচন। ওই সময় ‘জেনারেশন জেড’-এর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের প্রায় ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে, যা হত্যাযজ্ঞ ও দুর্নীতিতে পরিপূর্ণ ছিল বলে সাময়িকীটি উল্লেখ করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাবে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনবে এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ক মেরামতের সূচনা করবে।
তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাব্য প্রধান মুখ হিসেবে তুলে ধরার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক টাইম ম্যাগাজিন ও ব্লুমবার্গসহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে দ্য ইকোনমিস্ট।
সাময়িকীটি গত ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানের দেশে ফেরার দৃশ্য বর্ণনা করে জানায়, বুলেটপ্রুফ বাসে করে ঢাকায় ফেরার সময় উচ্ছ্বসিত সমর্থকেরা রাস্তায় নেমে আসেন। সে সময় বাসটি কয়েক মাইল ধীরগতিতে চলছিল, যেন অপেক্ষমাণ মানুষ তাকে কাছ থেকে দেখতে পারেন।
দ্য ইকোনমিস্ট আরও মন্তব্য করেছে, ২০০৮ সালের পর বাংলাদেশে আর কোনো ‘যথাযথ’ নির্বাচন হয়নি। দেশটির প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ কখনও প্রকৃত অর্থে ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
নিরাপত্তাবিষয়ক থিঙ্কট্যাংক বিআইপিএসএস-এর শাফকাত মুনিরকে উদ্ধৃত করে সাময়িকীটি লিখেছে, “আমার জীবনের দুই দশক ধরে আমার ভোটের কোনো মূল্য ছিল না।” তিনি বলেন, বর্তমানে রাজধানীর রাস্তাঘাটজুড়ে নির্বাচনী ব্যানারে ভরে উঠেছে—যা রাজনৈতিক পরিবেশের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষণে বলা হয়, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এই নির্বাচন তত্ত্বাবধান করাই হবে শেষ বড় দায়িত্ব। তবে “অধিকাংশ মানুষ একমত যে, এই সরকার অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করেছে।”
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার রাজনীতিকদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেছে—যার মধ্যে রয়েছে নতুন একটি উচ্চকক্ষ গঠন এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমিত করা—যা ভবিষ্যতে স্বৈরতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হবে।
জামায়াতে ইসলামী প্রসঙ্গে দ্য ইকোনমিস্ট লিখেছে, দলটি দাবি করছে যে তারা নির্বাচিত হলে ‘সব বাংলাদেশির জন্য সংযতভাবে শাসন করবে’, তবে তাদের উত্থান শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দলটি এবারের নির্বাচনে একজন নারী প্রার্থীও দেয়নি এবং অতীতে কখনও সংসদে ১৮টির বেশি আসন না পাওয়ায় রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতাও তাদের সীমিত।
এই প্রেক্ষাপটেই তারেক রহমানের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে সাময়িকীটি। কারণ, বিএনপি বর্তমানে জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছে।
দ্য ইকোনমিস্ট স্মরণ করিয়ে দেয়, দীর্ঘদিন বিএনপি পরিচালিত হয়েছে তারেক রহমানের প্রয়াত মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। তার আগে দলটির নেতৃত্বে ছিলেন তার বাবা, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, যিনি ১৯৮১ সালে নিহত হন। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে মোট তিনবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে।
সাময়িকীটি আরও লিখেছে, তারেক রহমান বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ না করলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—নির্বাচিত হলে তার সরকার বিনিয়োগকারীদের সহায়তা করবে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এবং তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে জোর দেবে, যাতে তারা বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরি পেতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি পানির সংকট মোকাবিলায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন এবং বছরে পাঁচ কোটি গাছ লাগানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার কাজের বোঝাপড়া ভালো হবে। তার ভাষায়, 'আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বেশ বাস্তববাদী—তিনি একজন ব্যবসায়ী।'
সবশেষে দ্য ইকোনমিস্ট লিখেছে, তারেক রহমানের মতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনে বিক্ষোভকারীদের হত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিচার হতে হবে, তবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করা হবে না।
প্রতিবেদনে তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, '২০২৪ সালের বিপ্লব দেখিয়েছে—যেসব সরকার জনগণের জন্য কোনো কর্মসূচি রাখে না, তাদের পরিণতি কী হতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “প্রতিশোধপরায়ণতা কারও জন্যই ভালো কিছু বয়ে আনে না।'
সাময়িকীটি উপসংহারে মন্তব্য করেছে, লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর তারেক রহমান মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী কথা বলছেন। যদিও এখনো অনেকেই ‘অফ দ্য রেকর্ড’ কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন—ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার আশঙ্কায়। তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, 'ফিরে আসা এই তারেক রহমান আগের চেয়ে ভিন্ন।'