শনিবার, ২৬শে সেপ্টেম্বর,
২০২৬

  • সারাদেশ

  • ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে লোকসানের শঙ্কায় নওগাঁর কৃষক


    সোনারদেশ ২৪ ডেস্ক


    শনিবার, ২৬শে সেপ্টেম্বর,

    ২০২৬

    /

    2 বার পড়া হয়েছে


    a

    সোনারদেশ২৪: ডেস্কঃ


    সরকার সাম্প্রতিক সময়ে প্রতি লিটার ডিজেলের মূল্য ২০টাকা বৃদ্ধি করেছে। এতে করে প্রতি লিটার ডিজেলের মূল্য ১৩৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। আর এই মূল্য বৃদ্ধির কারণে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে ধান-চালসহ খাদ্য শস্য উৎপাদনে অন্যতম হিসেবে খ্যাত উত্তরের জেলা নওগাঁর কৃষিতে।

     

     

    এ জেলার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা সরাসরি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তাই জ্বালানি তেলের (ডিজেল) হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধিতে শুরুতেই তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। বোরো, আমন কিংবা বিভিন্ন সবজি চাষ—সবক্ষেত্রেই এখানকার কৃষকদের ডিজেলচালিত সেচ ও যন্ত্রপাতির ওপর ব্যাপক নির্ভরতা রয়েছে। ফলে জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে ফসলভেদে কৃষকদের উৎপাদন খরচ ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

     

     

    বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম না পেলে কৃষকরা চাষাবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। আর এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার ওপর।

     

     

    স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এমনিতেই সার, বীজ ও কীটনাশকের চড়া দামের বিপরীতে বাজারে ফসলের কাঙ্ক্ষিত মূল্য মিলছে না। এর ওপর ডিজেলের দাম বেড়ে ১৩৫ টাকা হওয়ায় ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে। কেবল সেচ দেওয়াই নয়; ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলার দিয়ে জমি চাষ, মই দেওয়া এবং পরিশেষে ধান মাড়াইয়ের প্রতিটি প্রক্রিয়াই এখন ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।

     

     

    কৃষকরা বলছেন, সেচ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজে বিঘাপ্রতি যে পরিমাণ ডিজেল পোড়ানো হয়, তাতে শুধু সেচ বাবদই বিঘাপ্রতি ৮০০ থেকে ১৫০০ (দেড় হাজার) টাকা পর্যন্ত খরচ বাড়বে। কেবল জমিতেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে উৎপাদিত ফসল ঘরে তোলা এবং বাজারে বিক্রি করার পুরো পরিবহন প্রক্রিয়াটিও ডিজেল মূল্যবৃদ্ধির এই নেতিবাচক প্রভাব এখন বাড়তি খরচের বড় এক যাঁতাকলে পড়েছে। সব মিলিয়ে কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বিঘা জমিতে ধান বা অন্যান্য ফসল উৎপাদনে সামগ্রিক খরচ আগের তুলনায় ১৫০০ থেকে ২৫০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত গুনতে হতে পারে, যা প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করবে। ফসল ফলানোর পর শেষ পর্যন্ত তার ন্যায্য দাম মিলবে কি না, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তায় নওগাঁর প্রান্তিক চাষিরা।

     

     

    রানীনগর উপজেলার কৃষক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, জমি বর্গা নিয়ে যা ফলাই, তার অর্ধেকই চলে যায় চাষ আর সেচ খরচে। এর মধ্যে ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে ট্রাক্টরওয়ালা থেকে শুরু করে পাম্পের মালিক—সবাইকে বাড়তি টাকা দিতে হচ্ছে। বিঘাপ্রতি খরচ যেভাবে দাঁড়াল, তাতে ধান কাটার আগেই লোকসানের হিসাব চোখের সামনে ভাসছে।’

     

     

    মান্দা উপজেলার গণেশপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল কাদের হিরা বলেন, ‘সবকিছুর দাম বাড়লেও শুধু ধানের দাম বাড়ে না। ধান চাষ থেকে শুরু করে ধান মাড়াই আর বাজারে নেওয়া—সব জায়গায় এখন শুধু খরচ আর খরচ। এভাবে খরচ বাড়তে থাকলে এই বাড়তি খরচ পুষিয়ে ফসলের ন্যায্য দাম কি বাজারে পাবো? সরকারের উচিত কৃষকদের বাঁচানোর জন্য ডিজেলের দাম কমানো।”

     

     

    মহাদেবপুর উপজেলার চকউরমপুর এলাকার কৃষক সোলায়মান আলী জানান, ‘আমাদের এলাকার মাঠগুলো একটু উঁচুতে হওয়ায় এমনিতেই বেশি পানি লাগে। আগে বিঘাপ্রতি জমিতে সেচ আর চাষ দিতে যে খরচ হতো, তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আমরা গরিব মানুষ, সার-বীজের দাম সামলে তেলের এই বাড়তি খরচ দেবো কোথায় থেকে?’

     

     

    সদর উপজেলার হাসাইগাড়ী এলাকার কৃষক রহিম উদ্দিন বলেন, ‘কীটনাশক আর বীজের দাম তো আগেই বাড়ছিল। এরপর কৃত্রিম সংকটে চড়া দামে সার কিনতে হলো। আর এখন ডিজেলের দাম বেড়ে ১৩৫ টাকা হওয়ায় জমি চাষ থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত প্রতিটা পদক্ষেপে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে। বাজারে ফসলের দাম তো আর সেই অনুপাতে বাড়ে না। খরচ যেভাবে বাড়ছে, তাতে আগামীতে বোরো ধান লাগানোর সাহস আর থাকবে না। জমি ফেলেই রাখা লাগবে।’

     

     

    কৃষকদের নায্য অধিকার নিয়ে কাজ করেন সিপিবির নওগাঁ সদর উপজেলার সাধারণ সম্পাদক আলিমুর রেজা রানা। তিনি বলেন, ধান-চাল উৎপাদনে অন্যতম এই জেলার কৃষকরা সাধারণত কৃষির উপর নির্ভরশীল। আর কৃষকরা বরাবরই তাদের নায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। এবার আরও লোকসানে পড়বে তারা। কারণ ডিজেলের দাম লিটারে ২০টাকা বাঁড়ানো হয়েছে। এতে করে এর প্রভাব পড়বে কৃষিসহ প্রায় সকল ক্ষেত্রেই। তাই আমি চাইবো সরকার যেন কৃষকদের নায্য অধিকারের প্রতি নজর দেয়।

     

     

    সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) জেলা সমন্বয়ক জয়নাল আবেদিন মুকুল বলেন, ‘নওগাঁর কৃষিপণ্য শুধু এ জেলার চাহিদা মেটায় না, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের জোগান দেয়। কিন্তু ডিজেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় কৃষকের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে। উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেলে চাষিরা একসময় চাষাবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার ওপর। তাই নওগাঁর কৃষি অর্থনীতি সচল রাখতে এবং প্রান্তিক কৃষকদের বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে কৃষি খাতে বিশেষ জ্বালানি ভর্তুকি বা সহজ শর্তে প্রণোদনা চালুর জোরালো দাবি জানাচ্ছি।’

     

     

    এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোঃ মনজুর রহমান জানান, ‘ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে খুব সমস্যা হবেনা। সরকারের পক্ষ থেকে প্রণোদনা ও বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হয়। পাশাপাশি সেচ কাজে সাশ্রয়ী হওয়ার জন্য আমরা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি। বিশেষ করে ডিজেলচালিত সেচ পাম্পের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ও খরচসাশ্রয়ী সৌরবিদ্যুৎচালিত (সোলার ইরিগেশন) সেচ পাম্প ব্যবহারের ওপর আমরা জোর দেওয়া হচ্ছে।’



    সংবাদটি শেয়ার করুন


    সম্পাদক ও প্রকাশকঃ জিয়াউল হক
    নির্বাহী সম্পাদকঃ মোস্তাক আহম্মেদ নওশাদ


    যোগাযোগ- মুজিব সড়ক, কমিউনিটি হাসপাতাল ৫ তলা, সিরাজগঞ্জ
    ইমেইল- sonardesh24.corr@gmail.com
    মোবাইল : 01324 977 175, 01716-076444




    Copyright © 2026 - All right reserved by Sonar Desh 24 Ltd