রপ্তানি বাণিজ্য-সংক্রান্ত বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের বিধিবিধান একত্র করে নতুন সমন্বিত নীতিমালা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এতে পণ্য ও সেবা রপ্তানি, রপ্তানি আয় দেশে আনা, ওপেন অ্যাকাউন্টে রপ্তানি
, ডিজিটাল পদ্ধতিতে বাণিজ্যিক নথি প্রক্রিয়াকরণ, বিকল্প বাণিজ্য অর্থায়ন, ই-কমার্স, সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা, ফ্রিল্যান্সারদের আয় এবং রপ্তানি
আয়ের ডিজিটাল নিষ্পত্তি-সংক্রান্ত নির্দেশনা এক জায়গায় আনা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ-১ থেকে গতকাল এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। নতুন প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে রফতানি বাণিজ্য-সংক্রান্ত বিভিন্ন সময়ে জারি হওয়া আগের নির্দেশনাগুলো রহিত হবে। তবে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন-সংক্রান্ত নির্দেশিকার (গাইডলাইনস ফর ফরেন এক্সচেঞ্জ ট্রানজ্যাকশনস বা জিএফইটি)-র দ্বিতীয় খণ্ডে থাকা প্রতিবেদন-সংক্রান্ত নির্দেশনা বহাল থাকবে। নতুন নির্দেশনাগুলো সার্কুলার জারির তারিখ থেকে এক বছর কার্যকর থাকবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নীতিমালায় রপ্তানি বাণিজ্যের প্রচলিত বিধিবিধানের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর ও বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক এক্সপোর্ট ডিক্লারেশন বা ই-এক্সপি ফরম ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। কাস্টমসের ইলেকট্রনিক ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে রপ্তানি-সংক্রান্ত তথ্য বিনিময় ও প্রক্রিয়াকরণ সহজ করার নির্দেশনাও এতে রয়েছে। এর ফলে রপ্তানি ঘোষণা, চালান ও রপ্তানি আয়ের তথ্যের মধ্যে সমন্বয় বাড়বে।
নীতিমালায় রপ্তানি আয় দেশে আনার নির্ধারিত সময়সীমা চার মাস বহাল রাখা হয়েছে। অর্থাৎ রপ্তানি পণ্য জাহাজীকরণের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রপ্তানি মূল্য দেশে আনতে হবে। তবে কাঁচা পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি ক্ষেত্রে অপরিবর্তনীয় নিশ্চিত ঋণপত্র বা ওপেন অ্যাকাউন্ট ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ ৩৬০ দিন পর্যন্ত রপ্তানি আয় দেশে আনার সুযোগ থাকবে। নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি আয় দেশে না এলে সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারক ও ব্যাংকের বিরুদ্ধে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে।
রপ্তানি আয় প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলোর দায়িত্বও নতুন নীতিমালায় স্পষ্ট করা হয়েছে। রফতানি বিলের অর্থ নির্ধারিত সময়ে দেশে আনা, বিলের তথ্য যাচাই, বকেয়া রফতানি আয় অনুসরণ এবং প্রয়োজনীয় তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রতিবেদন করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে পালন করতে হবে। রফতানি আয়ের কোনো অংশ অনাদায়ী থাকলে তার কারণ অনুসন্ধান এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার কথাও বলা হয়েছে।
ওপেন অ্যাকাউন্ট ক্রেডিট ব্যবস্থায় রপ্তানির ক্ষেত্রে অর্থপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এ ব্যবস্থায় বিদেশী ফ্যাক্টরিং প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ট্রেড ফাইন্যান্সার বা বীমা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা কিংবা রফতানি ঋণঝুঁকি সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখতে হবে। রপ্তানিকারকদের জন্য রপ্তানি বিলের বিপরীতে আগাম অর্থপ্রাপ্তি বা বিকল্প অর্থায়নের সুযোগও রাখা হয়েছে। তবে এ ধরনের অর্থায়নের ব্যয় নির্ধারিত বেঞ্চমার্ক সুদহারের ওপর সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ পর্যন্ত সীমিত থাকবে।
নতুন নীতিমালায় ডকুমেন্টারি কালেকশনের আওতায় রফতানি নথি নিরাপদ ইলেকট্রনিক মাধ্যমে উপস্থাপন ও প্রক্রিয়াকরণের সুযোগ দেয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলো নিজেদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিবেচনায় ধাপে ধাপে এ পদ্ধতি চালু করতে পারবে। তবে ডিজিটাল নথির সত্যতা, নিরাপত্তা ও তথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে হবে। এতে কাগজভিত্তিক নথি ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরতা কমার পাশাপাশি রফতানি বিল প্রক্রিয়াকরণে সময় ও ব্যয় কমতে পারে।
এছাড়া ই-কমার্সের মাধ্যমে পণ্য রফতানি, সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা রফতানি এবং ফ্রিল্যান্সারদের বৈদেশিক মুদ্রা আয় দেশে আনার বিধানও নতুন সমন্বিত সার্কুলারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে ও অন্যান্য বৈধ ডিজিটাল মাধ্যমে রফতানি আয় গ্রহণ এবং তা দেশে আনার সুযোগ রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রচলিত পণ্য রফতানির বাইরে ডিজিটাল বাণিজ্য ও সেবা রফতানির ক্রমবর্ধমান লেনদেনকে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে রপ্তানি বিলের বিপরীতে অর্থপ্রাপ্তি, রপ্তানি আয়ের সমন্বয়, রপ্তানি মূল্য কমানো বা ছাড় দেয়া এবং রপ্তানি লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণ-সংক্রান্ত বিধানও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিশেষ ক্ষেত্রে রপ্তানি মূল্যের ওপর ছাড় বা সমন্বয়ের প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে প্রয়োজনীয় নথি যাচাই এবং প্রযোজ্য বিধিবিধান অনুসরণ করতে হবে। রপ্তানি লেনদেনের তথ্য ও নথি সংরক্ষণ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের চাহিদা অনুযায়ী তা সরবরাহের দায়িত্বও ব্যাংকগুলোর ওপর থাকবে।