আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ সোনারদেশ২৪:

এতদিন বলা হতো, কভিড-১৯ সংক্রমণ হলে জ্বর, কাশি, স্বাদ গন্ধের অনুভূতি চলে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। কিন্তু এমন কিছু লোক আছেন যাদের দেহে কোন উপসর্গই দেখা দেয় না, জানতেও পারেন না নীরবে অন্যদের সংক্রমিত করে চলেছেন।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বিজ্ঞানীদের বরাত দিয়ে বলা হয়, ঠিক কত মানুষের মধ্যে এরকম ‘উপসর্গবিহীন’ সংক্রমণ ঘটেছে, এবং এই ‘নীরব বিস্তারকারীরাই’ এই ভাইরাস এত ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার জন্য দায়ী কিনা— তা জানা এখন খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে।

১৯ জানুয়ারি সিঙ্গাপুরের দ্য লাইফ চার্চ অ্যান্ড মিশন নামের গির্জায় রবিবারের প্রার্থনায় যারা জড়ো হয়েছিলেন, তারা কেউ ভাবতেই পারেননি এখান থেকে করোনাভাইরাসের বিশ্বব্যাপী সংক্রমণের সূচনা ঘটতে যাচ্ছে।

ওইদিন প্রার্থনায় উপস্থিত ছিলেন এক প্রৌঢ় দম্পতি। তাদের দুজনেরই বয়স ৫৬– কারোরই কাশি ছিল না, অন্য কোন উপসর্গ বা স্বাস্থ্য সমস্যাও ছিল না। ফলে গির্জার কারোরই তাদের নিয়ে অন্য কিছু ভাবার কোন কারণ ছিল না। অথচ তারা সেদিন সকালেই আসেন চীনের উহান শহর থেকে– যা তখন করোনাভাইরাস সংক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু।

২২ জানুয়ারি প্রথমে নারীটি অসুস্থ হয়ে পড়লেন, আর দুদিন পর অসুস্থ হন স্বামী। এক সপ্তাহের মধ্যে সিঙ্গাপুরের তিনজন স্থানীয় লোক অসুস্থ হয়ে পড়লেন। কোথা থেকে কীভাবে তারা সংক্রমিত হলেন– কেউ বুঝতে পারছিল না। সিঙ্গাপুরে করেনাভাইরাস বিস্তারের সেখান থেকেই সূচনা।

রোগের উৎস সন্ধানকারী গোয়েন্দারা কয়েকদিনের মধ্যে সেই গির্জার ১৯১ জন লোকের সঙ্গে কথা বললেন, দেখতে পান তাদের মধ্যে ১৪২ জন সেই দিনের প্রার্থনায় উপস্থিত ছিলেন। এটাও বেরিয়ে এলো তার মধ্যে যে দু‌জন সংক্রমিত হয়েছিলেন– তারা সেই চীনা দম্পতির সাথে একই প্রার্থনায় ছিলেন। কিন্তু যে ৫২ বছর বয়স্ক নারী তৃতীয় সংক্রমিত ব্যক্তি ছিলেন– তিনি সেই প্রার্থনায় উপস্থিত ছিলেন না। তবে গির্জাতেই সেদিন অন্য একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি কীভাবে সংক্রমিত হলেন?

সেই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে তদন্তকারীরা গির্জার সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করেন। তা থেকেই বেরিয়ে এলো অপ্রত্যাশিত তথ্য। চীনা দম্পতি গির্জা থেকে চলে যাওয়ার পর তারা যে চেয়ারে বসেছিলেন, কয়েক ঘণ্টা পর সেই চেয়ারেই বসেছিলেন আক্রান্ত নারীটি।

চীনা দম্পতিটির হয়তো কোন অসুস্থতা ছিল না বা কোন উপসর্গ ছিল না– কিন্তু তা সত্বেও তারা না জেনেই করোনাভাইরাস ছড়িয়ে অন্যদের সংক্রমিত করেছেন। হয়তো তাদের হাতে ভাইরাস লেগে ছিল, বা হয়তো তাদের শ্বাস-প্রশ্বাস থেকে এটা ছড়িয়েছে।

উপসর্গ দেখা দেবার আগেই রোগ বিস্তারকে বলে প্রি-সিম্পটম্যাটিক ট্রান্সমিশন। অর্থাৎ, যখন কারো দেহে কভিড-১৯ সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দেবার আগেই অন্যদের মধ্যে রোগ ছড়াতে শুরু করে।

এই জরিপে দেখা যায়, করোনাভাইরাস কারো শরীরে ঢোকার পর ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত সময়ে কোন লক্ষণ দেখা না দিলেও- আক্রান্ত ব্যক্তি ‌অত্যন্ত সংক্রামক‌ বা হয়তো সবচাইতে বেশি সংক্রামক হতে পারেন। তাই কারো দেহে উপসর্গ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাছাকাছি আসা ব্যক্তিদের আইসোলেশনে যাওয়ার জন্য সতর্ক করতে  হবে।

কিন্তু ঠিক কীভাবে একজন থেকে আরেকজনে ভাইরাস ছড়ায়– তা এখনো স্পষ্ট নয়। সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি দেবার সময় নাক-মুখ দিয়ে যে ড্রপলেটস্ বা অতি ক্ষুদ্র পানির কণা বেরিয়ে আসে তার মধ্যেই থাকে ভাইরাস। কিন্তু যার কাশির উপসর্গ দেখা দেয়নি সে কীভাবে ভাইরাস ছড়াবে?

কোন কোন বিশেষজ্ঞ বলছেন, কথা বলার সময় বা শ্বাস-প্রশ্বানের মাধ্যমেও ড্রপলেটস্ বেরিয়ে আসতে পারে। কারণ এ সময়টা শ্বাসনালীর ওপরের অংশেই ভাইরাসগুলো অবস্থান করে এবং প্রতিবার নি:শ্বাস ফেলার সময়ই এগুলো বেরিয়ে আসতে পারে। কাজেই কাছাকাছি কেউ থাকলে বিশেষত ঘরের ভেতরে, খুব সহজেই সংক্রমিত হতে পারে।

সংক্রমণের আরেকটা বড় উপায় হলো স্পর্শ। কারো হাতে ভাইরাস লেগে থাকলে তিনি যদি আরেকজনের হাত ধরেন, বা দরজার হাতল, টেবিল-চেয়ার বা অন্য কিছু স্পর্শ করেন – তার মাধ্যমেও এটা ছড়াতে পারে।

কিছু লোকের দেহে ভাইরাস সংক্রমণ ঘটেছে কিন্তু তার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না– এই রহস্যময় ব্যাপারটা কীভাবে ঘটে তার কোন সুনির্দিষ্ট উত্তর বিজ্ঞানীরা দিতে পারছেন না।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ সংক্রান্ত ২১টি গবেষণা প্রকল্পের উপাত্ত পরীক্ষা করে দেখেছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কার্ল হেনেগ্যান। তিনি বলছেন, উপসর্গবিহীন কভিড-১৯ ভাইরাস বহনকারীর অনুপাত ৫ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এর সংখ্যা নির্ণয় করার মতো নির্ভরযোগ্য জরিপ একটিও নেই।

ক্যালিফোর্নিয়ার একদল বিজ্ঞানী বলছেন, মহামারীর ব্যবস্থাপনার ওপর এ ধরনের উপসর্গবিহীন সংক্রমণের ঝুঁকি এক গভীর প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশে একে একে লকডাউনজনিত বিধিনিষেধ শিথিল করা হচ্ছে, তখন এই অদৃশ্য ঝুঁকির মোকাবিলা করা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।