লাইফস্টাইল ডেস্কঃ সোনারদেশ২৪:

করোনাভাইরাস! হ্যাঁ, এটি মারাত্মক পরিস্থিতি তৈরি করেছে এবং অবশ্যই প্রত্যেককে সতর্ক থাকতে হবে। কিন্তু ভাইরাসটি সম্পর্কে প্রতিনিয়ত তথ্যের ছড়াছড়ি, পূর্বপ্রস্তুতির পরামর্শ ও সাবধানবাণী মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ‘মনের বাঘ’ দূর করতে হবে।

কথায় বলে, ‘বনের বাঘে খায় না, মনের বাঘে খায়।’ সুতরাং করোনা আতঙ্কে মানসিকভাবে কাবু হওয়া চলবে না।

করোনাভাইরাস নিয়ে এতো বেশি তথ্য বা তথ্যের লিংক পাওয়া যাচ্ছে যে, প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় উভয় ধরনের তথ্যানুসারে সতর্ক থাকতে গিয়ে মানুষ দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ছেন অথবা অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। লোকজন একটা অস্থিরতার মধ্য দিয়ে দিনযাপন করছেন। আর প্রতিনিয়ত অস্থিরতায় থাকলে মানসিক স্বাস্থ্য ভেঙে পড়তে পারে। তাহলে এই মহামারিতে মানসিক স্বাস্থ্যকে কিভাবে রক্ষা করবেন? জেনে নিন কিছু উপায়।

তথ্যের উৎস কমিয়ে ফেলুন

আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের রিসার্চ অ্যান্ড পলিসির সহযোগী নির্বাহী পরিচালক লিন বাফকা বলেন, ‘করোনাভাইরাস সম্পর্কে শতশত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কোন তথ্যটি সঠিক তা নির্ণয় করা।’ এর ফলে মনের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব চলে। কিন্তু এটা দীর্ঘস্থায়ী হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যস্ত হতে পারে। তাই লিন বাফকা তথ্য প্রাপ্তিতে নিয়ন্ত্রণ আনতে কিছু পদক্ষেপ সাজেস্ট করেছেন, যেমন কয়েকটি বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের উৎস থেকে তথ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করে অন্য উৎসগুলো বাদ দিয়ে দিন। একটি জাতীয়, একটি আন্তর্জাতিক ও একটি স্থানীয় উৎস নির্বাচন করুন। দুটি বিশ্বাসযোগ্য আন্তর্জাতিক উৎস হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) ও ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। জাতীয় উৎস থেকে দেশের পরিস্থিতি জানতে পারবেন ও স্থানীয় উৎস থেকে যেখানে আছেন সেখানকার তথ্য পাবেন।

ফোনের ব্যবহার কমানোর চেষ্টা করুন। হাতের কাছে ফোন থাকলে করোনাভাইরাস সম্পর্কিত আপডেট জানতে ইচ্ছে হবে। লিন বাফকা বলেন, ‘করোনাভাইরাস সম্পর্কে প্রত্যেকটি তথ্য জানা ও অনিশ্চয়তায় ভোগার কোনো দরকার নেই। বরং এভাবে চিন্তা করুন: টর্নেডোর মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে যত দ্রুত সম্ভব তথ্য জানা প্রয়োজন। কিন্তু করোনাভাইরাস টর্নেডো নয়। তাই সব ধরনের তথ্য পাওয়ার তাড়না কমাতে ফোনকে দূরে রেখে দিন। কিংবা নিউজ সাইট অথবা সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতিনিয়ত নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন।

সোশাল মিডিয়া ব্যবহারে আত্মনিয়ন্ত্রণের পরিচয় দিন। এটা ঠিক যে সোশাল মিডিয়া ব্যবহারে অভ্যস্ত লোকদের পক্ষে এর ব্যবহার কমানো কঠিন। কিন্তু তাই বলে হাল ছেড়ে দেয়া উচিত নয়। এটা মনে রাখতে হবে যে, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে যেসব তথ্য ও মন্তব্য পাওয়া যাচ্ছে তার বেশিরভাগই নির্ভরযোগ্য নয়। অপ্রয়োজনীয় তথ্য এড়াতে সোশ্যাল মিডিয়া আপাতত আনইন্সটল করে দিতে পারেন। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়া চলতে না পারলে নিউজফিড স্ক্রলিংয়ের সময় করোনাভাইরাস সম্পর্কিত লিংকে প্রবেশের ইচ্ছে কঠোরভাবে দমন করুন।

ভয়কে জয় করুন

ভাইরাসের মহামারি হচ্ছে বিমূর্ত খলনায়ক। ভাইরাস দেখা যায় না বলে মহামারিতে মানুষ এতটা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে যে ঘর থেকে বের হতে চান না। কিন্তু এভাবে চলতে পারবেন না। আতঙ্কে আতঙ্ক বৃদ্ধি পেয়ে মানসিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট ভয়কে শনাক্ত করে আতঙ্ক কমানোর চেষ্টা করতে হবে। আপনি কি করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে মৃত্যুর ভয় পাচ্ছেন? লিন বাফকা বলেন, ‘মৃত্যুর ভয় মানুষের মধ্যে প্রোথিত অস্তিত্ব রক্ষার ভীতিকে জাগিয়ে তোলে। কিন্তু আপনাকে এটা শনাক্ত করতে হবে যে কি কারণে ভয় পাচ্ছেন এবং তা কতটা বাস্তবসম্মত?’

ভয়ে জমে যাওয়া এড়াতে আপনার ব্যক্তিগত ঝুঁকি বিবেচনা করুন- এই ভাইরাসের সংস্পর্শ আসার সম্ভাবনা কতটুকু তা পরিমাপের চেষ্টা করুন। আপনি বা আপনার পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে অথবা করোনাভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণ দেখা গেলে সবচেয়ে খারাপ পরিণতি ভেবে আতঙ্কিত হবেন না। হয়তো আপনার বা পরিবারের কোনো সদস্যের শরীরে করোনাভাইরাস রয়েছে, আবার নাও থাকতে পারে। কারণ করোনাভাইরাসের আক্রমণে মানুষ যে অসুস্থতা অনুভব করে তা অন্য রোগের কারণেও হতে পারে। শরীরে সত্যিই করোনাভাইরাস পাওয়া গেলে নিরাশ হবেন না। আশা ধরে রাখুন ও চিকিৎসা নিন। ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি উচ্চ নয়। বেশিরভাগ মানুষই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন। এসময় মন থেকে আশা বিলুপ্ত হলে শরীরকে সারিয়ে তোলা কঠিন হবে। রোগ যত বড় হবে, তত বেশি আশাবাদী হতে হবে। শুধু চিকিৎসা নয়, আশার মধ্যেও রয়েছে নিরাময় শক্তি।

লিন বাফকা বলেন, ‘আমরা সবচেয়ে খারাপ পরিণতি কল্পনা করে অবান্তর প্রতিক্রিয়া দেখাই এবং সমস্যা মোকাবেলার জন্য আমাদের যে ক্ষমতা রয়েছে তাকে উপেক্ষা করি।’ এতে মানসিক স্বাস্থ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। অবশ্য বাস্তবসম্মত ভয়ের প্রয়োজন রয়েছে। এ ধরনের ভয় আমাদেরকে সম্ভাব্য বিপদ মোকাবেলা করতে প্রস্তুত রাখে। কিন্তু ভয়ের মাত্রা স্বাভাবিক সীমা অতিক্রম করলে এবং সেইসঙ্গে অবান্তর ভীতিও যুক্ত হলে মানসিক বিপর্যয় ঘটতে পারে। লিন বাফকা বলেন, ‘কিছু লোক দুশ্চিন্তা করেন যে কোয়ারেন্টিনে যেতে হলে কাজকর্মের কি হবে? কিন্তু কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলার ক্ষেত্রে মানুষের সক্ষমতা তাদের ধারণার চেয়েও বেশি।’ সম্ভাব্য বিপদের জন্য প্রস্তুত থাকলে ভয়ের মাত্রা লাগামের মধ্যে থাকবে, যেমন- জীবাণুনাশক সামগ্রী কেনা, চিড়ার মতো শুকনো খাবার কিনে রাখা ও ব্যাংক থেকে কিছু টাকা তুলে ঘরে রাখা।

অন্যদের কথা ভাবুন

মহামারিতে ভাইরাসের প্রকৃতি অনুসারে সঠিক পদক্ষেপ নিলে ব্যক্তিগত উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তা কমে। কিন্তু আপনাকে দশজনের কথাও চিন্তা করতে হবে। আপনার চেয়েও অধিক ঝুঁকিতে রয়েছে এমন মানুষদের সাহায্যার্থে কি করতে পারেন তা বিবেচনা করুন। সেসব মানুষদের সহায়তা করার কথা ভাবতে পারেন যাদের জীবিকা একদম থমকে গেছে। সামর্থ্য থাকলে সংক্রমণ প্রতিরোধী উপকরণ সরবরাহ করতে পারেন। লিন বাফকা বলেন, ‘মহামারির সময় সমাজের মানুষের কল্যাণ-চিন্তা গুরুত্বপূর্ণ। যাদের সুযোগ-সুবিধা বা আর্থিক-সামর্থ্য কম তাদেরকে কিভাবে সাপোর্ট দেয়া যায়?’ সমাজে যত বেশি মানুষের মধ্যে ভাইরাসটি ছড়াবে, আপনার ঝুঁকিও তত বেড়ে যাবে। তাই নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে অন্যদের সুস্থতাও জরুরি। যখন কেউ অন্যদের কল্যাণের কথা ভাবেন তখন তার ব্যক্তিগত উদ্বেগও কমতে থাকে। কিন্তু অন্যদের মঙ্গল করতে গিয়ে নিজের নিরাপত্তার কথা ভুলে গেলেও চলবে না। নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই অপরের জন্য কিছু করতে হবে, যেমন- ফেস মাস্ক ব্যবহার করা, হ্যান্ডশেক থেকে বিরত থাকা, জীবাণুনাশক তরল দিয়ে হাত পরিষ্কার করা ও যেখানে সেখানে স্পর্শ না করা।

পরামর্শ নিন

যে ভাইরাসের মহামারি চলে সেই ভাইরাস নিয়ে সর্বত্র আলোচনা চলে। এসময় লোকজন নিজেদেরকে ও পরিবারের সদস্যদেরকে সুরক্ষিত রাখার প্রয়াসে একে অপরের সঙ্গে কথা বলেন। করোনাভাইরাস নিয়ে পরামর্শ পেতে চাইলে এমন কারো সঙ্গে কথা বলার দরকার নেই যিনি আপনার মতো আতঙ্কের মধ্যে আছে ও করণীয় সম্পর্কে সন্দিহান। সেসব মানুষদের সঙ্গেও কথা বলা অসার যারা কথায় কথায় স্রষ্টার গজব বলে গলা ফাটায়। লিন বাফকা বলেন, ‘আপনি ইতোমধ্যে করোনাভাইরাসের ভয়ে আচ্ছন্ন হলে এমন কারো সঙ্গে কথা বলা অনর্থক যারও একই মাত্রার ভয় রয়েছে। আলোচনার জন্য এমন কাউকে খুঁজুন যিনি কঠিন পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রাখতে পারেন। তিনি আপনার দুশ্চিন্তা কমাতে পারবেন ও কিছু কার্যকরী পরামর্শ দিতে পারবেন।’ সম্ভব হলে সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

মৌলিক প্রয়োজনের দিকে মনোযোগ দিন

করোনাভাইরাস আতঙ্কে এতটা আচ্ছাদিত হওয়া উচিত নয় যেখানে প্রয়োজনীয় ও সুস্থ চর্চাগুলো ভুলে যান। এতে আপনি অসুস্থ হয়ে যাবেন। অসুস্থ অবস্থায় দুর্ঘটনাবশত করোনাভাইরাসের সংস্পর্শে এলে নিরাময় পাওয়া কঠিন হতে পারে। তাই প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যে থেকে আপনার ইমিউন সিস্টেম তথা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেবেন না। করোনাভাইরাস সংক্রমণে দুর্বল ইমিউন সিস্টেমের মানুষদের মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি। লিন বাফকা বলেন, ‘মানসিক চাপ বা আতঙ্কের সময় আমরা মৌলিক প্রয়োজনগুলোকে উপেক্ষা করতে থাকি, কিন্তু মহামারির সময় এসব প্রয়োজন মেটানো আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’ এসময় এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করুন: পর্যাপ্ত ঘুম যেতে হবে, পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে ও নিয়মিত শরীরচর্চা করতে হবে। যা চর্চা করলে দুশ্চিন্তা ও আতঙ্ক কমবে তাতে অভ্যস্ত হোন, যেমন- ধ্যান ও যোগব্যায়াম করতে পারেন এবং মজার মজার ভিডিও দেখতে পারেন। মনকে ভয়ের জগতে বিচরণ থেকে বিরত রাখে এমন যেকোনো কাজই করতে পারেন।