যশোর প্রতিনিধিঃ সোনারদেশ২৪:

ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের আঘাতে যশোর জেলায় ১২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া গাছপালা ভেঙে পড়ে ও ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত মৃত ছয় ব্যক্তির পরিবারকে জেলা প্রশাসন নগদ ২০ হাজার টাকা করে সহায়তা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিউল আরিফ।

পুলিশের বিশেষ শাখার হিসাব অনুযায়ী নিহতরা হলেন, মণিরামপুর উপজেলার পারখাজুরা গ্রামের খোকন দাস (৭০), তার স্ত্রী বিজন দাস (৬০), ওয়াজেদ আলী (৫০), তার ছেলে ইসা (১৫) ও আছিয়া বেগম (৭০); শার্শা উপজেলার গোগা গ্রামের ময়না বেগম, সামটা জামতলার মুক্তার আলী (৬৫), মহিপুড়া গ্রামের মিজানুর রহমান (৬০) ও মালোপাড়ার গোপালচন্দ্র বিশ্বাস; চৌগাছা উপজেলার চাঁদপুর গ্রামের ক্ষ্যান্ত বেগম (৪৫), তার মেয়ে রাবেয়া খাতুন (১৩) এবং বাঘারপাড়ার বোধপুর গ্রামের ডলি বেগম (৪৮)।  দেয়াল ও গাছ চাপা পড়ে তাদের মৃত্যু হয়।

জেলা ইন্টেলিজেন্স অফিসার (ডিআইও-১) এম মসিউর রহমান নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

রাতে যোগাযোগ করা হলে জেলা প্রশাসক জানান, অনেক উপজেলায় এখনো বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। এমনকি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে আরও মৃত্যু ঘটতে পারে বলে তিনি জানান।

যশোরের শেখহাটি জামরুলতলা এলাকার সত্তরোর্ধ্ব আবুল কাশেম বলেন, সন্ধ্যা (বুধবার, ২০ মে) থেকে সারারাত জুড়ে তাণ্ডব চালিয়েছে আম্ফান। গাছপালা ভেঙে পড়েছে মানুষের বসতঘরের ওপর। বাতাসের তীব্রতায় ছাদের ওপর পানির ট্যাংক পর্যন্ত উড়ে গেছে। পুরো রাত তারা নির্ঘুম কাটিয়েছেন।

ঘূর্ণিঝড়ে জেলায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, মাত্র কয়েকদিন আগে বোরো আবাদ ঘরে তুলেছে কৃষক। যে কারণে ঝড়ে বোরো ধানের তেমন ক্ষতি হয়নি। তবে সবজি, পাট, পান, আম, লিচুসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক কৃষিবিদ ড. আকতারুজ্জামান বলেন, জেলার ক্ষয়ক্ষতির তথ্য কৃষি মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে। ক্ষতি হওয়া ফসলের মধ্যে রয়েছে ১১ হাজার ৭৮৩ হেক্টর জমির পাট; ১১ হাজার ৭৪৮ হেক্টর জমির সবজি, যা মোট আবাদের ৮০ শতাংশ। এছাড়া ৭৫০ হেক্টর জমির পেঁপে, দেড় হাজার হেক্টর জমির কলা, ৬৭৫ হেক্টর জমির মরিচ, ৩ হাজার ৩৯৫ হেক্টর জমির আম, ৬০০ হেক্টর জমির লিচু এবং ১ হাজার হেক্টর জমির পানের বরজ ক্ষতির মুখে পড়েছে।

মাঠে থাকা ফসল ও ফলের ৭০ শতাংশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান জেলার এই কর্মকর্তা।

জেলার কেশবপুর, মণিরামপুর, অভয়নগর উপজেলার ভবদহ এলাকায় পানিতে তলিয়ে গেছে শত শত হেক্টর জমির ফসল। ভেসে গেছে ঘেরের মাছ।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান বলেন, ঝড়ের সঙ্গে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে কেশবপুর, মণিরামপুরের নিম্নাঞ্চলের কিছু ঘের ও পুকুর ভেসে মাছের ক্ষতি হয়েছে।

ঝড়ের আঘাতে গাছপালা ভেঙে জেলার অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক-মহাসড়ক আটকে যায়। ঐতিহাসিক ‘যশোর রোডের’ (যশোর-বেনাপোল মহাসড়ক) প্রাচীন বেশকিছু গাছ ভেঙে ও উপড়ে রাস্তার উপর পড়ে। ফলে দুপুর পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কটি বন্ধ ছিল। এছাড়া যশোর-খুলনা মহাসড়ক, যশোর-মাগুরা মহাসড়ক, যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কসহ অধিকাংশ সড়ক ও গ্রাম্য রাস্তার উপর গাছ ভেঙে পড়ে। সকাল থেকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এ সব গাছ সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করেন।

ঝড়ে বিদ্যুতের তারের ওপর গাছপালা ভেঙে পড়ায় গোটা জেলা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বুধবার সন্ধ্যায়। টানা ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার পর কিছু কিছু এলাকায় সংযোগ দেওয়া হয়। তবে এখনো জেলার দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা বিদ্যুৎহীন রয়েছে বলে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন।

জেলা প্রশাসক শফিউল আরিফ বিকেলে জানান, ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত বিবরণ এখনো নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। ঘরবাড়ি ও গাছপালা ভেঙে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মাঠে থাকা ফসল নষ্ট হয়েছে।

এর আগে ১৯৮৮ সালে যশোরে বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড় আঘাত করেছিল।