শিরোনাম:

ফের হোয়াইট হাউস ছাড়তে হচ্ছে মেজরকে

প্রথম ডোজের তথ্য না থাকায় দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণে ভোগান্তি

সাংবাদিকদের ‘মুভমেন্ট পাস’ লাগবে না

মুভমেন্ট পাস: ঘণ্টায় ১ লাখ ২৫ হাজার আবেদন

কুমারখালীতে প্রতিবন্ধী নারীকে ধর্ষণ, গ্রেফতার ২

ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে শিশুরা

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২১

সোনারদেশ২৪: ডেস্কঃ

মুনিয়া বেগম (০৯)। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়াশোনা করে। জন্মের পর থেকেই নানা ধরনের রোগবালাই পিছু ছাড়েনি তাকে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসক দেখিয়েছে তার পরিবার। কোনো ফল পাইনি। তারপর এলাকার এক চিকিৎসকের পরামর্শে রাজধানীর বারডেমে নিয়ে আসা হলো। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা গেল টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মুনিয়া। তখন তার বয়স সাত কিংবা আট বছর। সেই থেকে তার চিকিৎসা চলছে।

মুনিয়ার মা জেসমিন বেগম মেয়ের সার্বক্ষণিক দেখাশুনা করেন। নরসিংদী জেলার শিবপুর থেকে রাজধানীতে এসেই চিকিৎসা করান মেয়ের। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, ‘প্রতিক্ষণে মুনিয়ার ডায়াবেটিস (রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা) ওঠানামা করে। দিনে কয়েকবার রক্ত পরীক্ষা করতে হয়। নিয়ম করে চারবার ইনসুলিন নিতে হয়। এছাড়া অন্য ওষুধ তো আছেই। সব মিলেয়ে প্রতি মাসে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকার ওষুধ লাগে। গত চার মাস আগে এই হাসপাতালে ভর্তি করে দুই মাস চিকিৎসা করতে হয়। তিন লাখ টাকা খরচ হয়েছে। সে সময় বাড়ির জমিও বিক্রি করতে হয়েছে। তবে এখন চিকিৎসকের পরামর্শে ভালোই আছে। সুস্থ আছে। ’

দোহারের মেহেদী হাসান (১৩)। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াশোনা করে এলাকার একটি স্কুলে। সাত বছর থেকে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। প্রতিদিন তিনবার নির্দিষ্ট সময়ে ইনসুলিন নিতে হয়। মেহেদীর মা রহিমা খাতুন বলেন, ‘আমার ছেলে ছয় বছর ধরে ইনসুলিন নিয়েই সুস্থ আছে। স্কুলে পড়াশোনা করছে, খেলাধুলা করছে। একটা নিয়মের মধ্যে রাখেছি। এতে আমার কষ্ট হলেও ছেলে ভালো আছে। ’

শুধু মেহেদী হাসান, মুনিয়া কিংবা নাহিদ নয় তাদের মতো আরও প্রায় সাত হাজার শিশুর তালিকা আছে রাজধানীর বারডেম জেনারেল হাসপাতালে (মা ও শিশু)। তারা এই প্রতিষ্ঠানসহ সারাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ আছে। ভালো আছে।

বাডাসের চেঞ্জিং ডায়াবেটিস ইন চিলড্রেন প্রোগ্রামের প্রোগ্রাম ম্যানেজার কামরুল হুদা বাংলানিউজকে বলেন, আমাদের হিসাবে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শিশু ছয় হাজার ৮১৭ জন তালিকায় ছিল। আর চলতি বছরের এ পর্যন্ত তালিকা প্রায় ৭ হাজার নাম আছে। প্রতিবছর শূন্য থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত ( শিশু, কিশোর, তরুণ) নতুন করে যুক্ত হচ্ছে ৪০০-৫০০ জন।

আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশনের (আইডিএফ) তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে মোট ১৮ হাজার শিশু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এরমধ্যে ৮২ শতাংশ টাইপ-১ এবং ১৮ শতাংশ টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোটদের যে ডায়াবেটিস হয়, সেটা বড়দের থেকে ভিন্ন। শিশুদের হয় টাইপ-১ ডায়াবেটিস। আর বড়দের হয় টাইপ-২ ডায়াবেটিস। টাইপ-১ ডায়াবেটিসে শিশুদের শরীরে রক্তকে নিয়ন্ত্রণ করে ‘ইনসুলিন’ নামক যে হরমোন, সেটা তৈরি হয় না। তাই ইনসুলিন ছাড়া এটা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। গত ১০ বছরের পরিসংখ্যান বলছে, শিশুদের টাইপ-২ ডায়াবেটিসও বাড়ছে। টাইপ-২ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। শিশুদের টাইপ-১ ডায়াবেটিস কেন হচ্ছে, এর সঠিক কোনো কারণ এখন পর্যন্ত নির্ণয় হয়নি।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো ক্ষেত্রে এটির জন্য জিনকে দায়ী করা হয়, আবার কিছু ক্ষেত্রে পরিবেশগত কারণ ও ভাইরাসের সংক্রমণকেও দায়ী করা হয়। এছাড়া শিশুর জন্মের পর প্রথম তিন মাস বুকের দুধের পরিবর্তে গরুর দুধ খাওয়ালে শিশুর টাইপ-১ ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা আছে। যদি দ্রুত শিশুর টাইপ-১ ডায়াবেটিস শনাক্ত করা যায়, তাহলে শিশুর শ্বাসকষ্ট শুরু হবে এবং মৃত্যুও হতে পারে। অথচ শুধু ইনসুলিন শুরু করলেই সেই ভয়াবহ বিপদ থেকে শিশুকে রক্ষা করা যায়।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের বারবার প্রসাব লাগা, ওজন কমে যাওয়া, পিপাসা পাওয়া, খিদে পাওয়া, দুর্বল বোধ করা, কোনো কাজে মন না বসা। এই ছয়টি লক্ষণ থাকলে প্রাথমিকভাবে বুঝা যায় শিশুর ডায়াবেটিস হয়েছে। তখনই দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। ডায়াবেটিস নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সবার আগে জীবনযাপনের ধরণ পরিবর্তন করতে হবে। শারীরিক পরিশ্রম বাড়াতে হবে। নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপনের মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রেখে সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকা যায়। এজন্য সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

বাডাসের চেঞ্জিং ডায়াবেটিস ইন চিলড্রেন প্রোগ্রামের কো-অর্ডিনেটর ডা. বেদৌরা জাবীন বাংলানিউজকে বলেন, টাইপ-১ ডায়াবেটিস আক্রান্ত বাচ্চার এক দিনও ইনসুলিন ছাড়া সুস্থ থাকা সম্ভব না। কিন্তু বেশিরভাগ শিশু স্বল্প আয়ের পরিবার থেকে আসছে। যাদের পক্ষে এই শিশুদের ব্যয়ভার বহন করা কঠিন। তাদের জীবনে শুধু ইনসুলিন নয়, এর পাশাপাশি প্রতিদিন রক্ত পরীক্ষা করতে হয়। দিনে তিন থেকে চারবার ইনসুলিন নিতে হয়, তিন থেকে চার বার রক্তের গ্লুকোজ পরীক্ষা করাতে হয়, এটা ব্যয়বহুল। এর পাশাপাশি চার থেকে পাঁচবার পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারও তাদের দিতে হয়। তাই আমরা বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছি। আমরা ইনসুলিনসহ বিভিন্ন ওষুধ শিশুদের বিনামূল্যে দিচ্ছি।

চেঞ্জিং ডায়াবেটিস ইন চিলড্রেন প্রোগ্রামের প্রোগ্রাম ম্যানেজার কামরুল হুদা বলেন, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত দরিদ্র পরিবারের শিশু রোগীদের আমরা বিনামূল্য চিকিৎসা দিই। আমাদের এ প্রতিষ্ঠানে একটা প্রকল্পের মাধ্যমে এ সেবা দেওয়া হচ্ছে। মোট রোগীর প্রায় ৬৬ শতাংশ শিশু রোগীর সকল চিকিৎসা বিনামূল্যে করা হয়। আর পারিবারিকভাবে স্বচ্ছল পারিবারের ৮ শতাংশ শিশু রোগী সম্পূর্ণ নিজস্ব খরচে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বাকিরা ২৬ শতাংশ শিশু রোগী বিভিন্ন হারে কম মূল্য পরিশোধ করে চিকিৎসা নিচ্ছে।

পূর্ববর্তী সংবাদ পরবর্তী সংবাদ
সর্বশেষ সংবাদ
  • সর্বাধিক পঠিত