এসিল্যান্ডকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা, ডিসির প্রত্যাহার চান মুক্তিযোদ্ধারা

দিনাজপুর প্রতিনিধিঃ সোনারদেশ২৪:

দিনাজপুরে মুক্তিযোদ্ধার প্রতি অবহেলা ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই দাফনের ঘটনায় তদন্ত কমিটির কাছে লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেনের ছেলে নুর ইসলাম।

এ ঘটনায় জড়িত এসিল্যান্ডকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার পাশাপাশি জেলা প্রশাসককে (ডিসি) দ্রুত দিনাজপুর থেকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা। এ ঘটনায় প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধনের ডাক দিয়েছেন তারা।

রোববার দিনাজপুর সদর উপজেলার ৬নং আউলিয়াপুর ইউনিয়নের যোগীবাড়ি গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের মৃত্যু-পরবর্তী মিলাদ-মাহফিল, দোয়া ও কুলখানি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা অংশগ্রহণ করেন। এ সময় বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ দিনাজপুর জেলা ইউনিট কমান্ডের ডেপুটি কমান্ডার সাইদুর রহমান এ ঘোষণা দেন।

একই সঙ্গে আগামীকাল সোমবার সকাল ১০টায় দিনাজপুর জেলা প্রশাসক চত্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিকৃতির সামনে মানববন্ধন ও সমাবেশ করা হবে বলেও জানান সাইদুর রহমান।

ডেপুটি কমান্ডার সাইদুর রহমান বলেন, মরহুম মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের সঙ্গে দেখা করেননি জেলা প্রশাসক। একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে দিয়ে বাড়ির কাজ করিয়েছেন এসিল্যান্ড। এ ঘটনায় প্রতিবাদের অংশ হিসেবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতির সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন কর্মসূচির ঘোষণা করছি। সেই সঙ্গে এসিল্যান্ডকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করছি। পাশাপাশি জেলা প্রশাসককে এখান থেকে প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি। মুক্তিযোদ্ধাদের কারণেই ওই চেয়ারে বসতে পেরেছেন জেলা প্রশাসক। তিনি যেন আর ওই ধরনের চেয়ারে বসতে না পারেন। বিষয়টি তদন্ত করে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিমকে অনুরোধ জানাচ্ছি আমরা।

সাবেক ডেপুটি কমান্ডার আকবর আলী বলেন, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের ওপর অন্যায় অত্যাচার ও সুইপারের মতো কাজ করানো হয়েছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রীয় মর্যাদা কেন নিতে চাননি? কারণ জেলা প্রশাসক তার সঙ্গে দেখা করেননি। এটি চাট্টিখানি কথা নয়। মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি, ইসমাইল হোসেন মনে আঘাত পেয়েছেন এবং পরে অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন। আমরা এর ন্যায্যবিচার দাবি করছি এবং ডিসি ও এসিল্যান্ডকে পদচ্যুত করার দাবি রাখছি।

গতকাল শনিবার তদন্ত কমিটির কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান নুর ইসলাম। সেখানে তিনি এসিল্যান্ডের বাড়ির কাজ, রান্নার কাজ, এমনকি বাথরুম পরিষ্কার করানো হতো বলেও উল্লেখ করেছেন।

লিখিত অভিযোগে নুর ইসলাম উল্লেখ করেছেন, রান্না ভালো না হওয়ায় আমাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এমনকি সরকারি বাড়ি থেকেও বের করে দেয়া হয়েছে। বিষয়টি জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিমকে জানানোর কারণে আমার বাবাকে অপমানিত করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক আমার বাবার সঙ্গে দেখা করেননি। এমনকি জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে জোর করে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। এ ঘটনার পরই আমার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

নুর ইসলাম বলেন, শনিবার আমি বিভাগীয় কমিশনার গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) জাকির হোসেন বরাবরে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। আমার বাবা অপমান সইতে না পেরে অসুস্থ হয়ে মারা যান। এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই আমরা।

গত বৃহস্পতিবার (২৪ অক্টোবর) চিঠিতে লিখে যাওয়া অসিয়ত অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় মর্যাদা (গার্ড অব অনার) ছাড়াই মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেনকে দাফন করা হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিমের কাছে একটি চিঠি লেখার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেন।

ছেলের বিষয়টি হুইপকে জানিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেন চিঠিতে লিখেছেন, ‘জীবন বাজি রেখে অস্ত্র হাতে নিয়ে করা স্বাধীন দেশে আমার ছেলের রুজি রোজগারটুকু অন্যায়ভাবে কেড়ে নেয়া হলো। গত ২১ অক্টোবর থেকে এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের ২নং ওয়ার্ডের ৪৪নং বেডে চিকিৎসাধীন আমি। এ অবস্থায় এই পত্রটি তোমার কাছে লিখছি। তোমার কাছে আমার আকুল আবেদন তুমি ন্যায়বিচার করো।’

মুক্তিযোদ্ধা লিখেছেন, ‘ঠুনকো অজুহাতে আমার ছেলেটিকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তাকে চাকরি ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করো। আমার বয়স প্রায় ৮০ বছরের কাছাকাছি। ছেলেটি হঠাৎ চাকরিচ্যুত হওয়ায় একে তো আমি শারীরিকভাবে অসুস্থ তারপর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে হঠাৎ যদি আমার মৃত্যু হয়, আমাকে যেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন না করা হয়। কারণ এসিল্যান্ড, ইউএনও, এডিসি, ডিসি যারা আমার ছেলেকে চাকরিচ্যুত, বাস্তুচ্যুত করে পেটে লাথি  মেরেছে, তাদের সালাম-স্যালুট আমার শেষ যাত্রার কফিনে আমি চাই না।

২২ অক্টোবর নিজের লেখা চিঠিটিতে স্বাক্ষর করে ডাকযোগে ঢাকায় জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিমের কাছে এ চিঠি পাঠিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেন। পরদিন ২৩ অক্টোবর বেলা ১১টায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

এরই মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেনের মৃত্যু ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই দাফনের ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। শনিবার দুপুরে বিভাগীয় কমিশনার গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) মো. জাকির হোসেন ঘটনা তদন্তে মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের বাড়িতে যান। সেখানে চাকরির প্রস্তাব দিলে বাবার মৃত্যুর ক্ষোভে চাকরি প্রত্যাখ্যান করলেন মুক্তিযোদ্ধার ছেলে।